নির্বাসিত রাষ্ট্রনায়করা কোথায় যান?

সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ ১১:১৯ সকাল

নিউজ ডেক্সঃ

নির্বাসিত রাষ্ট্রনায়করা- সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন পারভেজ মোশাররফ। নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করে দুর্দান্ত প্রতাপের সঙ্গে পাকিস্তানে শাসন করেছেন দীর্ঘ সাত বছর। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই কোণঠাসা হতে থাকেন তিনি।

হত্যা, সংবিধান লঙ্ঘন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের আইনসভা তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ করে। রাজনৈতিক দলগুলিও তুলে নিতে থাকে সমর্থন। এরপর যেন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় মোশাররফের ।

আর কোন পথ না পেয়ে পদত্যাগ করেন। তারপর সৌদি আরবে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে যান। মোশাররফ পাকিস্তানে কয়েক দফায় ফিরতে চেয়েছেন। তবে অনুমতি না পেয়ে নিজ দেশেই ফিরতে পারেননি এক সময়ের দুর্দান্ত প্রতাপশালী এই স্বৈরশাসক।

নির্বাসনের গন্তব্য হিসেবে পারভেজ মোশাররফের সৌদি আরব বেঁছে নেওয়া কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। রাষ্ট্রনায়কেরা নির্বাসনের গন্তব্য নির্ধারণে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে থাকেন। এগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভৌগোলিক নৈকট্য ও সম্ভাব্য রাষ্ট্রের নানা চরিত্র অন্যতম।

মজার ব্যাপার হলো সাবেক উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশগুলোই রাষ্ট্রনায়কদের নির্বাসনের প্রথম পছন্দ। এই রাষ্ট্রনায়কেরা নির্বাসনের গন্তব্য হিসেবে গণতান্ত্রিক দেশগুলো এড়িয়ে চলেন। আর স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক আশ্রয় খোঁজেন।

তবে গণতান্ত্রিক দেশটি যদি প্রধান শক্তিশালী বন্ধু রাষ্ট্র হয় তবে নির্বাসনের জন্য এর থেকে ভালো বিকল্প আর হয় না। নির্বাসিত রাষ্ট্রনায়করা দীর্ঘসময়ের জন্য নিরাপত্তা চান। তাই এত বিচার বিবেচনা। আর পারভেজ মোশাররফের ক্ষেত্রে উল্লেখিত সকল কোটাই পূরণ করেছে সৌদি আরব।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় অপরাধী নেতাদের নিষ্ক্রিয় করতে নির্বাসনে পাঠানো বেশ কার্যকরী। যেমন ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনের নেতা ফারদিনান্দ মার্কোসকে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইতে বিলাসবহুল নির্বাসনে পাঠানো হয়। এতে ফিলিপাইনে শান্তি ফিরে এসেছিল।

মার্কোস ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। তারপরও ম্যানিলাতে অতিবাহিত দিনগুলোর মতোই যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইতেও উচ্চ বিলাসী জীবন যাপন করেছেন তাঁরা। মার্কোস প্রতি রোববার নৈশভোজ ও পার্টির আয়োজন করতেন।

সেখানে ধনকুবেরদের সমাগম হতো। তাঁর স্ত্রী মাঝে মধ্যেই হনুলুলুর বিলাসী ডিজাইনার বুটিকে কেনাকাটা করতে যেতেন। তাদের আইনজীবী বলেছিলেন ধার করা অর্থের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে মার্কোসকে। এই দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকার পরও তারপরও তাঁদের বিলাসী জীবনে কখনো ভাটা পরেনি।

একই ভাবে হাইতির দুর্নীতিগ্রস্ত ও সহিংস নেতা জিন ক্লদ দ্যুভালিয়ান ফ্রান্সে, উগান্ডার ইদি আমিন সৌদি আরবে, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর মবুতু সেসে সেকো মরক্কোতে, লাইবেরিয়ার চার্লস টেইলর নাইজেরিয়াতে নির্বাসিত হয়েছেন।

স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বহিষ্কৃত নেতাদের নির্বাসনে নিরাপত্তা প্রাপ্তি অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৯৪৬ সালের পর বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশ কমপক্ষে একজন করে নির্বাসিত রাষ্ট্রনায়ককে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এখন বিশ্বের প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সহজে নির্বাসন মঞ্জুর করতে চায় না।

তার উপর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কাউন্সিলের(আইসিসি) সদস্য দেশগুলো নির্বাসিতদের আশ্রয় দিতে পারে না। অনেক সময়ই আইসিসির হাতে এই নেতাদের তুলে দিতে বাধ্য করা হয়। তাই পূর্বের মতো নির্বাসনে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না নির্বাসিত নেতারা।

সম্প্রতি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। তাঁর ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একাধিক মামলায় দণ্ডিত। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। এমন অবস্থায় বিশ্বের অনেক নেতার মতোই বেগম জিয়ারও নির্বাসনে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা আছে।