একাদশ জাতীয় সংসদের মন্ত্রীসভার শপথ সোমবার

January 4, 2019 2:10 pm

নিউজ ডেক্সঃ

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন গতকাল। আগামী সোমবার বিকালে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ। কাঙ্ক্ষিত সেই কেবিনেটে চতুর্থবারের মতো আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আরো একটি রেকর্ড করতে যাচ্ছেন তিনি। গতকাল মহাজোটের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতক্রমে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন গতিধারাকে আরো বেগবান করতে নতুন মন্ত্রিসভায় আনছেন তরুণ ও অভিজ্ঞদের। বিভিন্ন সময় বিতর্কিত এবং দুর্নীতিতে জড়িতদের বাদ দিয়ে গঠন করতে যাচ্ছেন নতুন মন্ত্রিসভা। অভিজ্ঞ ও নতুনদের সমন্বয়ে একটি গতিশীল মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ এরই মাঝে শুরু করা হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকারে এবার মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগে ‘গতানুগতিক’ রীতি অনুসরণ করা হবে না। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে দল ও বিভিন্ন সংস্থা পরিচালিত জরিপে উঠে আসা নেতাদের দক্ষতা, ত্যাগ, বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বসহ সার্বিক কর্মকান্ড বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব যোগ্যতার মাপকাঠিতে যারাই উন্নীত হবেন তাদের সমন্বয়েই গঠিত হবে নবীন ও প্রবীণদের নতুন মন্ত্রিসভা। এতে বাদ পড়তে পারেন পুরনো অনেকেই। বিশেষ করে বিতর্কিত অদক্ষ ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়াদের বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর বাইরে বেশি বয়স্কদের এবার এমনিতেই মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হবে না বলে নির্বাচনের আগেই চাউর হয়েছিল।

আর নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারে রয়েছেন ২০১৪ সালে যারা এমপি হয়েছেন, যথেষ্ঠ যোগ্যতা থাকার পরও গত মন্ত্রিসভায় যারা স্থান করে নিতে পারেননি এমন কয়েকজন। আবার মনোনয়ন জটিলতার কারণে বা কোন্দলের কারণে যারা মনোনয়নবঞ্চিত ছিলেন তাদের দু-একজনকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। সব মিলিয়ে এবারের মন্ত্রিসভায় প্রকৃত অর্থেই বড় ধরনের চমক থাকছে বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নীতিনির্ধারক। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহের সোমবার বিকাল ৩টায় মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সেই দিনই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন আওয়ামী দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।

এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপির বর্জনের মধ্যেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ১২ জানুয়ারি গঠিত হয় নতুন মন্ত্রিসভা। তখন শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে ৪৮ সদস্যবিশিষ্ট নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। ওই সরকারে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৯ মন্ত্রী, ১৭ প্রতিমন্ত্রী এবং দুজন উপমন্ত্রী ছিলেন। পরে কয়েক দফা মন্ত্রিসভায় রদবদল আনা হলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়ায় ৫২ সদস্যের।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, এবারের মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ছে। তরুণদের স্থান দিতে গিয়ে এই কলেবর বাড়ানোর চিন্তা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতে অভিজ্ঞ নেতাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তালিকায় চমকে দেয়ার মতো কিছু নাম আছে। আছে প্রবাসীও। এমপি নন এমন বেশ কয়েক নেতাও আছেন। আছেন ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও। তৃণমূলের দুজন নেতার নাম আছে এই তালিকায়। একঝাঁক তরুণকে স্থান দিতে অনেক পুরনোকে বাদের তালিকায় রাখা হয়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে এবারও সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা, যিনি একজন জননন্দিত নেতা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ তিনি চতুর্থবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। কেননা আমরা সর্বসম্মতিক্রমে তাকে আমাদের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করেছি।

গতকাল সংসদের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে বঙ্গভবনে ডেকে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন।

সরকারি দলের একাধিক নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, টানা তৃতীয়বার সরকার গঠনের মতো ‘বিশেষ’ অর্জনের বিষয়টি মাথায় রেখে সাজানো হবে এবারের মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রীসহ বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য ৫৩ জন। এবারের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করায় এবার কিছুটা বাড়তে পারে মন্ত্রিসভার কলেবর। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবারও মন্ত্রিসভায় মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের দুই নেতাকে দেখা যাবে। জাতীয় পার্টির একাধিক নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেওয়া হবে। আসন্ন মন্ত্রিসভায় কে হবেন অর্থমন্ত্রী—এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি এবং তিনি অর্থমন্ত্রী থাকছেন না এটা নির্বাচনের আগে মোটামুটি নিশ্চিতই ছিল। তবে গত মঙ্গলবার তিনি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি আরো এক বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে চান। এছাড়া অর্থমন্ত্রী হিসেবে আরো দুজনের নাম আলোচনায় আছে।

দশম সংসদে সরকারের সফল মন্ত্রী হিসেবে আলোচিত শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী একই মন্ত্রণালয়ে থাকতে পারেন। বয়োবৃদ্ধ ও প্রবীণ দু-তিনজন বাদ পড়তে পারেন। পদোন্নতি হতে পারে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু একই দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বলে জল্পনা রয়েছে। তবে এখানে নতুনভাবে যুক্ত হতে পারেন কুমিল্লার লাকসাম থেকে পর পর নির্বাচিত এমপি মোঃ তাজুল ইসলামও। উল্লেখ্য, তিনি গত সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

গণভবন সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরের মূল্যায়নে যাদের পারফরম্যান্স খারাপ, তারা সবাই বাদ পড়বেন। নবম সংসদের মন্ত্রিসভার যেসব মন্ত্রী দশম সংসদের মন্ত্রিসভায় বাদ পড়েছিলেন তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনাও কম।

নতুনদের মধ্যে যাদের নাম আলোচনায় আছে তারা হলেন—আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সালমান এফ রহমান, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ছেলে নাজমুল হাসান পাপন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের এমপি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, গাইবান্ধা-২ আসন থেকে নির্বাচিত মাহবুব আরা বেগম গিনি, বগুড়া-৫ আসনের হাবিবর রহমান, নওগাঁ-১ আসনের সাধনচন্দ্র মজুমদার, নাটোর-৪ আসনের মো. আবদুল কুদ্দুস, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের হাবিবে মিল্লাত, যশোর-৫ আসনের স্বপন ভট্টাচার্য, খুলনা-৪ আসনের আবদুস সালাম মুর্শেদী, সাতক্ষীরা-৪ আসনের এস এম জগলুল হায়দার, টাঙ্গাইল-৭ আসনের মো. একাব্বর হোসেন, নেত্রকোনা-৩ আসনের অসীম কুমার উকিল, নরসিংদী-৪ আসনের নুরুল মজিদ হুমায়ুন। আরো জানা গেছে, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম আলোচনায় আছে।

Please follow and like us: