যে কারনে প্রত্যাহার করা হয়েছে এসপি হারুনকে

নভেম্বর ৫, ২০১৯ ৩:২১ দুপুর

নিউজ ডেক্সঃ

নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে (ট্রেনিং রিজার্ভ) সংযুক্ত করা হয়েছে বিতর্কিত পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশীদকে। এই এসপির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, চাঁদার জন্য তিনি একাধিক শিল্পপতিকে তুলে নিয়ে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয় দেখিয়েছেন। এসপি হারুনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠলেও প্রভাবের কারণে কেউ কিছু বলতে পারেননি। বরং অভিযোগ থাকার পরও সব সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে এহেন কর্মকান্ডে কেবল এসপি হারুনই জড়িত? দেশে আর কোন এসপি কি এহেন কর্মকান্ডে জড়িত নেই? একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দেশের অনেক জেলায় এসপির বিশেষ অভিযানে ব্যবহার করা হয়, জেলা গোয়েন্দা সংস্থা ডিবি পুলিশকে। সেই ডিবি পুলিশে এসপির পছন্দের দু একজন এসআই আছেন যারা চাঁদাবাজিতে জড়িত। তারা, মিল, শিল্প কারখানার মালিক, শিল্পপতি বা ধণ্যাঢ্য, সমাজের উঁচু শ্রেণির বা সম্ভ্রান্ত লোকজনকে বিনা কারণে ধরে এনে যেকোন মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া, মাদক মামলা ভয়, অস্ত্র কারবারি দেখিয়ে মামলার হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করেন।

সংশ্লিষ্ট ডিবি পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়ার্টাসে অভিযোগও দাখিল করেন অনেক ভূক্তভোগী। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। কারণ হিসাবে জানা গেছে, এসব অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব পান সংশ্লিষ্ট জেলার এডিশনাল এসপিগণই বেশি। তদন্তকারী কর্মকর্তা এডিশনাল এসপিগণ নিজেদের বিশ্বস্ত অর্থাৎ নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট অভিযোগে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষেই প্রতিবেদন দাখিল করেন এর বিনিময়ে হাতিয়ে নেন মোটা অংকের টাকা। জানা গেছে, এসপি হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ করেন পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাসেমের ছেলে ও আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ (রাসেল)। ভূক্তভোগী রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে তুলে নিয়ে যায় নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশ। পরে তাঁরা মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। ওই ঘটনার বিবরণ দিয়ে শওকত আজিজ বলেন, চাঁদা নিয়ে হারুন অর রশীদের সঙ্গে তাঁর পূর্বে বিরোধ ছিল। সম্প্রতি তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নতুন একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন। সেখানেও এসপি হারুন অর রশিদ বাধা দিচ্ছিলেন।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার তিনি তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে একটি পার্টিতে নামিয়ে ঢাকা ক্লাবে আসেন। ক্লাব থেকে বেরিয়ে দেখেন তাঁর গাড়িটি নেই। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন গাড়ি আছে নারায়ণগঞ্জে। পরদিন রাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে এসপি হারুন একদল ডিবি পুলিশ নিয়ে তাঁর গুলশানের বাসায় ঢুকে ভাঙচুর করেন। এরপর তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যান। এ বিষয়ে নিকটস্থ গুলশান থানাকে কিছু জানায়নি নারায়ণগঞ্জের ডিবি পুলিশ। পরদিন তাঁর খোয়া যাওয়া গাড়িতে ইয়াবা, মদ ও গুলি উদ্ধারের ঘটনা সাজিয়ে তাঁর ও তাঁর গাড়িচালকের নামে মামলা করেন। গুলশানের বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও শওকত তাঁর ফেসবুকে শেয়ার করেন। তবে শওকত আজিজের স্ত্রী-পুত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর গত শনিবার নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ভিন্ন একটি গল্প শোনান এসপি হারুন অর রশিদ। তিনি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, শওকত আজিজের গাড়ি থেকে ২৮টি গুলি, ১ হাজার ২০০ ইয়াবা, ২৪ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, ৪৮ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। ওই সময় গাড়িতে শওকতের স্ত্রী ফারাহ রাসেল ও সন্তান আনাব আজিজ ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের আটক করা হয়েছিল। পরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এম এ হাসেম সহযোগিতা করবেন বলে মুচলেকা দেওয়ায় তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

শওকত আজিজ বলেন, এসপি হারুন অর রশিদের চাঁদাবাজি নিয়ে ২০১৬ সালের ৫ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে তিনি একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশনের আদেশে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহারের পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ তাঁর কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। তাঁর পক্ষে এসআই আজহারুল ইসলাম আম্বার ডেনিমের স্টোর ম্যানেজার ইয়াহিয়া বাবুকে ফোন করে টাকা দাবি করেন। এর আগেও গুলশান ক্লাবের লামডা হলে ও গুলশানের কাবাব ফ্যাক্টরি রেস্তোরাঁয় এসপি হারুন তাঁকে ডেকে নিয়ে ৫ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঠিকানায় পাঠাতে বলেন। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিমের ৪৫ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গাজীপুর থানায় ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়। শুধু শওকত আজিজই নন, গত ২৭ অক্টোবর রাতে এসপি হারুন অর রশিদের নির্দেশে ডিবি পুলিশ আরও একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ও তাঁর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে গুলশান থেকে তুলে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আটকে রাখেন। পরে জার্মান প্রবাসী একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা এবং পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুরোধে শিল্পপতিকে ছেড়ে দিলেও প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এখনো ওই কর্মকর্তা কারাগারে আছেন।

ওই ঘটনার বিবরণ দিয়ে বিজিএমইএর এক ব্যবসায়ী নেতা জানান, ওই রাতে ওই শিল্পপতি নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তাঁর গাড়িটি গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কের মুখে এলে সাদাপোশাকের একদল পুলিশ গাড়িটির গতি রোধ করে। চালককে জোর করে নামিয়ে দিয়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর শিল্পপতি ও তাঁর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে যান। এ ঘটনা পরে ব্যবসায়ী মহলে জানাজানি হলেও এসপি হারুনের ভয়ে শিল্পপতি কোনো অভিযোগ দিতে চাননি। অভিযোগ আছে, এসপি হারুন ওই শিল্পপতির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম বলেন, অপহরণ, গুম, চাঁদাবাজি সন্ত্রাসীর কাজ, পুলিশের নয়। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি সেটা করে তাহলে অবশ্যই তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। আর এ ধরনের সদস্য বাহিনীতে থাকলে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। সমাজেও ভীতির পরিবেশ তৈরি হবে। গাজীপুরের অনেকেই অভিযোগ করেন, নিরীহদের আটকের পর এসপি পছন্দের ডিবি পুলিশ কমকর্তাদের দিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করতো। টাকা না দিলে ইয়াবা, অস্ত্র, এমনকি মানি লন্ডারিং মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখাতো।

দেশের অনেক ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, প্রতিনিয়ত বিনা কারণে অনেককেই রাস্তা থেকে আটক করে আনা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে মাদক মামলায় আটকের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। যাঁরা চাহিদা মতো টাকা দিতে পারছেন না তাঁদের বিভিন্ন মামলায় আটক দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালতে জামিন না পেলে যেতে হচ্ছে কারাগারে। দাবি মতো টাকা না পেয়ে আটক অনেককে ক্রস ফায়ারের ভয়ও দেখানো হয়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আ্যাডভোকেট শাহরিয়ার কবির বলেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের উচিত পুলিশ প্রবিধান অনুসারে যেভাবে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে, সেটা কড়াকড়ি করা এবং কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো। বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন।