খেলাপি ঋণের কারনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য

জানুয়ারি ৬, ২০২০ ৯:৪৬ সকাল

নিউজ ডেক্সঃ

খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাতের অন্য সূচকগুলোর অবনতি ঠেকানো যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণের হার বেশি হওয়ায় ব্যাংক ঋণের সুদহার কমছে না। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য। এটা সরকারের টেকসই প্রবৃদ্ধিতে বাধা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, গুটিকয়েক খারাপ ব্যবসায়ীর কারণে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রয়েছে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে। আদায় করতে না পেরে ঋণ অবলোপন নীতিমালা শিথিল করার তদবিরে ব্যস্ত ব্যাংকগুলো। অবলোপন করে মন্দ ঋণ হিসাবের খাতা থেকে বাদ দিতে চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা; গত ডিসেম্বর যা ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত বছরের ডিসেম্বরে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা ছিল ৪০ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা; চলতি বছরে সেপ্টেম্বরে যা বেড়ে হয়েছে ৫৪ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে পাওনা বেড়েছে ১৪ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। মোট বৃদ্ধির ৬৫ শতাংশ বেড়েছে শীর্ষ খেলাপিদের কারণে। শীর্ষ খেলাপিদের কাছে পুঞ্জিভূত পাওনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে মোট খেলাপি ঋণের ৪৩ শতাংশ ছিল শীর্ষ ২০ খেলাপির পকেটে। এখন শীর্ষ ২০ খেলাপির পকেটে রয়েছে ৪৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অ্যাননটেক্স গ্রুপের কর্ণধার ইউনুস বাদল ২২টি প্রতিষ্ঠান খুলে জনতা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া এসব ঋণের অর্থ ফেরত দেননি। এখন ব্যাংকিং খাতের নাম্বার ওয়ান খেলাপি ইউনুস বাদল। জনতা ব্যাংকের মতো অন্য একাধিক ব্যাংক থেকে ইউনুস বাদলের কায়দায় হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অন্য শীর্ষ খেলাপিরা। অ্যাননটেক্স গ্রুপের মতো আরেক শীর্ষ খেলাপি ক্রিসেন্ট গ্রুপ জনতা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। নামে-বেনামে কোম্পানি খুলে ঋণ নিয়েছেন আবার ভুয়া কোম্পানির কাছে রপ্তানি করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। দেশের শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের নাম দ্বিতীয়। আরেক শীর্ষ খেলাপি চট্টগ্রামের শাহাবুদ্দিন আলমের এসএ গ্রুপ। এ গ্রুপ ২৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাতিয়ে নিয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। আরেক খেলাপি মোস্তাফা গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজতুর রহমানের কাছে ৩১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা দেড় হাজার কোটি টাকা।

জাতীয় পার্টি নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের ক্রিস্টাল গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ১২টি ব্যাংকের পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক জালিয়াতির আলোচিত প্রতিষ্ঠান হলমার্ক গ্রুপ। সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে গ্রুপটি। এছাড়া শীর্ষ খেলাপির তালিকায় আছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ, নূর জাহান গ্রুপ, অটবি, ইলিয়াস ব্রাদার্স, কেয়া গ্রুপ ইত্যাদি।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী রেজা ইফতেখার এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রভাবশালীদের অনেকেই ঋণ নিয়ে এখন শীর্ষ খেলাপি। আমরা বরাবরই বলে আসছি খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের প্রধান সংকট। খেলাপি ঋণ কমে গেলে সুদহার কমে যাবে। তাই খেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। তা হলে খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব হতে পারে।

সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বড় কিছু গ্রাহকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত। বিভিন্ন উপায়ে তারা ঋণের নামে প্রচুর টাকা বের করে নিয়েছেন এবং নানা কাজে লাগিয়েছেন; কিন্তু ফেরত দিচ্ছেন না। ঋণ ফেরত দেওয়ার আন্তরিকতাও তাদের মধ্যে দেখা যায় না।

সূত্র জানায়, প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকা আলাদাভাবে সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক সব ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের কাছে পাওনা আদায়ের কৌশল গ্রহণ করেছে। জুলাই ও সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায়ের চিত্র সংগ্রহ করা হয়েছে; কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

একক গ্রহীতার কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলে দিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো উদারহস্তে খেলাপিদের পকেটে টাকা তুলে দিয়েছে। সম্প্রতি বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক আগ্রাসীভাবে ঋণ দিতে গিয়ে একই গ্রাহককে বিপুল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের- ২১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। এ ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা গ্রাহকের সঙ্গে যোগসাজশ করে অ্যাননটেক্স গ্রুপকে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা এবং ক্রিসেন্ট গ্রুপকে ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। গ্রাহকরা সহজেই ঋণের টাকা পেয়ে তা পাচার করেছেন এবং অপব্যবহার করেছেন। শীর্ষ ২০ খেলাপির পকেটে ১৪ হাজার কোটি টাকা তুলে দিয়েছে জনতা ব্যাংক।

হলমার্ক গ্রুপকে ঋণ দিয়ে আলোচনায় থাকা সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে আছে ৩ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ১২ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশই আটকে আছে শীর্ষ ২০ খেলাপির পকেটে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আরেক ব্যাংক রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ২০ খেলাপির পকেটে রয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১০ বছরের মেয়াদে পুনঃতফসিল এবং এক বছরের মধ্যে এককালীন পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে হাজার চারেক আবেদন পড়েছে। তবে সেখানে শীর্ষ খেলাপিদের বেশি সংখ্যক আবেদন এসেছে।

জানা গেছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে, ব্যাংকগুলো থেকে জোরালো অনুরোধ এসেছে ঋণ অবলোপন নীতিমালা শিথিল করার। ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের হার কৌশলে কমাতে অবলোপন নীতিমালা শিথিল করতে প্রস্তাব করেছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবেচনায় রয়েছে। তবে সর্বশেষ ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বৈঠকের কাছে এর সঙ্গে আরো কিছু দাবি এসেছে। সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সাধারণভাবে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে তা ব্যাংকের স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক বিবেচনা করা হয়। তাই বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পরিষ্কার রাখতে খেলাপি ঋণ কমানোর সহজ পন্থা হিসেবে অবলোপনকে বেছে নিচ্ছে অনেক ব্যাংক। এক টাকা আদায় না করেও অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো হচ্ছে। এ প্রবণতা সুদহারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেননা ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডাররা প্রতি বছর ভালো লভ্যাংশ পেতে চান। তবে ঋণ অবলোপন বাড়লে সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে গিয়ে লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। আবার অনেক সময় গ্রাহককে না জানিয়েও ঋণ অবলোপন করার অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের বেকায়দায় পড়েন। কেননা একবার অবলোপন হলে সমুদয় পাওনা পরিশোধ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ থাকে না ব্যবসায়ীদের। এতে অনেকে পথেও বসে যান।

ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দমানে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণ ব্যালেন্স সিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। এ ধরনের ঋণগ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। একটি সময় যেকোনো অঙ্কের খেলাপি ঋণ অবলোপনের আগে মামলা করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে অনেক সময় মামলার খরচের চেয়ে বকেয়া ঋণ কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে এ নীতিমালা শিথিল করে মামলা না করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেওয়া হয়। তখন মন্দমানে খেলাপি হওয়ার অন্তত তিন বছর পর অবলোপন করা যাবে বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে অবলোপন প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে গত জুন পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। বর্তমানে বকেয়া রয়েছে ৪১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা।