প্রেরণার উৎস একজন ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধা

February 29, 2020 8:08 pm

অনলাইন ডেস্ক

বিতর্কিত সংবিধান সংশোধনী আইন (সিএএ) বাতিলের দাবিতে গোটা ভারত জুড়ে চলছে বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভের আগুনে ইতিমধ্যেই পুড়ে অঙ্গার হয়েছে রাজধানী দিল্লি। গত রোববার থেকে শুরু হওয়া ওই সহিংসতার আগুনে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৮ জন। আহত হয়েছেন আরও দুই শতাধিক মানুষ। বলা হচ্ছে, সিএএ বিরোধী আন্দোলনকে নসাৎ করতেই ইচ্ছাকৃতভাবে দিল্লিতে দাঙ্গা ছড়িয়েছে মোদির দলের লোকজন। তাই এই হত্যার দায় এড়াতে পারেন না ভারতের প্রধানমন্ত্রীও।

তবে দিল্লিতে দাঙ্গা ছড়িয়ে সিএএ বিরোধী আন্দোলনকারীদের দমন করা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। কেননা তাদের প্রেরণার উৎস যে একজন আশি বছর বয়সী বৃদ্ধা, সবার কাছে শাহিন বাগের ‘দাদি’। ভারতে তিনি বর্তমানে মোদি বিরোধী আন্দোলনের এক স্বীকৃত মূর্তি।

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম আনন্দবাজার জানায়, সিএএ আন্দোলনে উৎসাহ যোগাতে তিনি এখন চষে বেড়াচ্ছেন গোটা ভারত। অথচ এর আগে তিনি কোনও দিন বিমানে চড়েননি। চোখে ভাল দেখেন না। রক্তচাপেরও সমস্যা রয়েছে। খাওয়া বলতে দিনে এক বার। তা-ও সামান্য। অথচ এ অবস্থাতেও গত তিন দিনে পরপর তিনটি শহর সফর করেছেন শাহিন বাগের ‘দাদি’,৮২ বছর বয়সী বিলকিস। বর্তমানে তিনি রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাতে। কেরল থেকে কলকাতার বিমানে ওঠার সময়ে সঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘অসুবিধা হবে না তো? এত ক্ষণ বসতে পারবেন?’

মাথার ঘোমটা পরিপাটি করে টেনে নিয়ে বৃদ্ধার তড়িৎ জবাব, ‘গত ৭০ দিন ধরে তো শাহিন বাগেই বসে থাকলাম। বিমানে বসতে অসুবিধা কোথায়? ঠিক তো করেই নিয়েছিলাম, হয় মৃত্যুর পরে শাহিন বাগ থেকে উঠব, নয়তো দাবি পূরণ হওয়ার পরে।’

স্বামী মারা গিয়েছেন ১১ বছর আগে। পাঁচ পুত্র ও পুত্রবধূ, ১৯ জন নাতি-নাতনির সংসার ছেড়ে গত আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিলকিসের ঘর শাহিন বাগ। এখন দেশের নানা প্রান্তে শুরু হওয়া সিএএ, এনআরসি, এনপিআর-বিরোধী আন্দোলনে উৎসাহ দিতে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। সঙ্গী কয়েক জন যুবক-যুবতী।

বুধবার সেই সূত্রেই ‘দাদি’পৌঁছেছেন কলকাতায়। শুক্রবার পার্ক সার্কাসের আন্দোলনস্থলে যাওয়ার কথা তার। কমবয়সীদের সঙ্গে দৌড়ে পেরে উঠছেন? সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধা বললেন, ‘চোখে একটু কম দেখি। তবে অসুবিধা হচ্ছে না। বরং স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সরকারকে এই জনবিরোধী আইন পাল্টাতেই হচ্ছে। যেখানেই যাচ্ছি সকলকে বলছি, কখনও না কখনও সেই সকাল আসবে, যখন আমাদের দাবি পূর্ণ হবে। ততদিন সকলে এক হয়ে বসে থাকো।’

এখন দিল্লির যা পরিস্থিতি, তাতে কি শাহিন বাগে বেশি দিন বসা যাবে?

এই প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধার সঙ্গী, শাহিন বাগের আন্দোলনকারী সোনু ওয়ারসি, সৈয়দ জাওয়াদের দাবি, ‘কিছু লোকের উস্কানিমূলক মন্তব্যে হিংসা ছড়াচ্ছে। তারা কোন দলের, সকলেই জানেন। শাহিন বাগে প্রথম থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে।’

সোনু আরও বলেন,‘সরকার চাইলে জোর করে শাহিন বাগ থেকে লোকজনকে সরিয়ে দিতেই পারে। কিন্তু সংবিধান মেনে সরানো কঠিন। বলা হচ্ছে, আমরা রাস্তায় বসে আছি। কিন্তু আমাদের তো পার্ক বা স্কুল নেই। তাই রাস্তাতেই বসেছি।’

শোনা যাচ্ছিল, শাহিন বাগের আন্দোলনকারীরা নাকি সমঝোতা করতে চান…! কথা থামিয়ে বিলকিসের সঙ্গে আসা শামসাদ বিবি বললেন, ‘কত ভাবে যে আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে! তুমি ঘরে শুয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ করছ, আর আমরা ঠান্ডায় বসে আছি, রোদে পুড়ছি! আমাদের কি বসে থাকার শখ রয়েছে?’

কিন্তু এর বেশি বলতে পারলেন না শামসাদ বিবি। তাকে থামিয়ে দিয়ে দাদির কড়া জবাব,‘এত কথা কীসের! শাহিন বাগে গুলি চলেছে, ছেলেরা বোরখা পরে এসে ঝামেলা করেছে। কিন্তু আমরা কিছুরই পরোয়া করি না।’

মোটে ৩ দিনে তিনটে শহর চষে ফেলা বৃদ্ধার চোখে-মুখে ক্লান্তি নেই। তার কথায় উৎসাহিত হয়ে সঙ্গী যুবকেরা দেখালেন বুকের টি-শার্ট। তাতে লেখা, ‘শহরে শহরে শাহিন বাগ!’

তাদেরই এক জন বললেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ২৩ মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছে। ততদিন প্রাণপণ আন্দোলন চলবে। তার পরে যা রায় দেবে, মেনে নেব। কিন্তু শাহিন বাগ তুলে দিলেও সারা দেশে এর প্রভাব থেকে যাবে। ৭০ দিনের আন্দোলন আগামী ৭০ বছর দেশের রাজনীতিতে দিশা দেখাবে।’

প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরে মোদি সরকার বিরোধী দলগুলোর আপত্তি অগ্রাহ্য করে নাগরিকত্ব আইন পাস করে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা ভারত। ইতিমধ্যে অনেক রাজ্য সিএএ বিরোধী প্রস্তাব পাস করেছে। তবে এই আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিন বাগ আন্দোলন বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ওই আন্দোলনের তিন বৃদ্ধা, যাদের সবাই শাহিনবাগের দাদি হিসাবে সম্বোধন করছেন। এরা হলেন- ৯০ বছর বয়সী আসমা, ৮২ বছর বয়সী বিলকিস বানু এবং ৭৫ বছর বয়সী শর্বরী।

Please follow and like us: