আক্রান্ত ব্যক্তির সেলফ আইসোলেশন সম্পর্কে জেনে নিন

March 14, 2020 3:29 pm

অনলাইন ডেক্সঃ

করোনাভাইরাস নিয়ে দেশে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সেই সঙ্গে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়ে নানা প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে। যেহেতু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ খুব দ্রুত হয়, তাই ইতোমধ্যে ভাইরাসটিতে যারা আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা লক্ষণ দেখা দিয়েছে তাদের আইসোলেশন কেমন হওয়া উচিত, সেটা জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এটিকে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। চলমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকই সেলফ-আইসোলেশনে যাচ্ছেন। আইসোলেশনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভাইরাসটি যাতে না ছড়ায় এবং যিনি আইসোলেশনে যাচ্ছেন তিনি যাতে সুস্থ হয়ে উঠতে সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসা পান।

সেলফ-আইসোলেশন ও সেলফ-কোয়ারেন্টাইন

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ‘আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন’— এ দুটি শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। কোয়ারেন্টাইন তাদের জন্য যারা হয়তো সুস্থ, তবে ভাইরাসটির সংস্পর্শে গিয়ে থাকতে পারেন। কোয়ারেন্টাইনে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

আইসোলেশন তাদের জন্য যারা হয়তো ইতোমধ্যে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। ভাইরাসটির বিস্তার রোধে তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়।

কখন ভাববেন সেলফ-আইসোলেশনে যাওয়া উচিত

কারো যদি করোনাভাইরাসের লক্ষণ, অর্থাৎ সর্দি, গলা ব্যথা, কাশি, জ্বর (১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার বেশি), শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় কিংবা কেউ যদি এ ধরনের লক্ষণ দেখা গেছে এমন কারো বা আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে গিয়ে থাকেন, তাহলে সেলফ-আইসোলেশনে যাওয়ার ব্যাপারটি বিবেচনা করা উচিত। যারা এমন পরিস্থিতিতে আছেন, তাদের ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ফল পজিটিভ এলেই তাদের কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে ঘোষণা করা হয়।

আপনার কী করা উচিত এবং কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন, এসব নিয়ে মোবাইলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে, এমন সন্দেহে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অনেকেই সেলফ-আইসোলেশনে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে জনগণকে বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। একইসঙ্গে, যারা করোনা আক্রান্ত কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশে ফিরেছেন, তাদের দুই সপ্তাহের জন্য সেলফ-কোয়ারেন্টাইনে যেতে বলা হয়েছে। যাতে এ সময়ের মধ্যে তারা আক্রান্ত কি না নিশ্চিত হওয়া যায়।

সেলফ-আইসোলেশনে যাওয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে— অন্যদের সঙ্গে সব ধরনের শারীরিক যোগাযোগ এড়ানো। প্রত্যক্ষ ছাড়াও পরোক্ষ শারীরিক যোগাযোগ, যেমন: বাসন ও স্টেশনারির মতো জিনিসের মাধ্যমে যোগাযোগ এড়ানোও এ ধাপে অন্তর্ভুক্ত।

পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার পরিবার ও বন্ধুদের সতর্ক করুন। আপনার শিক্ষক কিংবা সহকর্মীদেরও জানান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রগুলোতে যারা আসেন, তারা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন। তাই এসব স্থানে পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মূলত, সাম্প্রতিক সময়ে যারা সরাসরি আপনার সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাদের সবাইকেই বলুন।

করোনাভাইরাসের লক্ষণগুলো নিশ্চিত হওয়ার পরেই প্রথমে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করুন এবং একটি আলাদা কক্ষে আইসোলেশনে থাকুন। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) পরামর্শ, অন্যদের থেকে অন্তত ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে প্রতিবার ২০ সেকেন্ড সময়ে নিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার পরামর্শও দিয়েছে এনএইচএস। এরপর টিস্যু কিংবা নির্দিষ্ট তোয়ালে দিয়ে হাত মুছুন। একইভাবে হাঁচি বা কাশির সময়েও টিস্যু বা নির্দিষ্ট তোয়ালে ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহারের পর টিস্যুটি ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতে হবে। তোয়ালেটি সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। সম্ভব হলে একা ঘুমান।

এ ছাড়া, সুযোগ থাকলে আলাদা শৌচাগার ব্যবহার করুন। তা সম্ভব না হলে শৌচাগার যাতে নিয়মিত ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়, তা নিশ্চিত করুন যাতে ভাইরাস ছড়াতে না পারে।

পরিবারের সদস্যদের বলতে হবে, আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তির জন্য খাবার দরজার বাইরে রেখে যেতে হবে। খাবার শেষে একইভাবে বাসনগুলো দরজার বাইরে রেখে দিতে হবে। যিনি বাসনগুলো পরিষ্কার করবেন, তার হাতে যেন গ্লাভস থাকে এবং সাবান দিয়ে বাসন পরিষ্কার করা হয়, তা নিশ্চিত করতে করতে হবে। যদি আপনি একা বাস করেন এবং কোনো কিছুর প্রয়োজন হয়, তাহলে কাছের কেউ অথবা কোনো দোকানদারের সহায়তা নিন।

অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকলে অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে খাবার অর্ডার করুন। যিনি খাবার নিয়ে আসবেন, তাকে পরিস্থিতি জানিয়ে বলুন খাবার যাতে দরজার বাইরে দিয়ে চলে যায়। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করুন। যাতে টাকার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ না থাকে।

যেভাবেই হোক বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন। এমনকি ঘরের ভেতরেও অন্য সদস্যদের সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত থাকুন।

বিশ্বব্যাপী ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত তিন জনকে শনাক্ত করলেও তাদের মধ্যে তাদের মধ্যে দুই জন সুস্থ হয়ে গেছেন। একজন ইতোমধ্যে নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।

ভাইরাসটি খুব দ্রুত ছড়ালেও যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

যদিও আপনি একটি কক্ষে কিংবা বাড়িতে নিজেকে আইসোলেশনে রাখছেন, আপনি চাইলেই বই পড়ে, সিনেমা দেখে কিংবা পছন্দের কোনো কাজ করে সময় কাটাতে পারেন। ফেসবুক কিংবা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পরিবারের সদস্য, আত্মীয় কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। আইসোলেশনের সময় এগুলো করে আপনার সময় কাটাতে এবং নিজেকে চাপ থেকে দূরে রাখতে পারবেন।

সব সময় খবরের আপডেট রাখুন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করুন।

নির্দিষ্ট সময় পর পর শরীরের তাপমাত্রা মাপুন এবং তা লিখে রাখুন। একইসঙ্গে কতটা ঘন ঘন হাঁচি বা কাশি হচ্ছে, তাও লিখে রাখুন। যদি একবারো মনে হয় যে আপনার শরীর খারাপ হচ্ছে, তাহলে কোনো ধরনের সংকোচ ছাড়াই চিকিৎসক কিংবা আইইডিসিআর-এর হটলাইনে ফোন করুন। যদি ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকার পরেও অবস্থার উন্নতি না হয়, তাহলে তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তাদের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

প্রবাদে রয়েছে— ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো’। অবশ্যই কেউ সেলফ-আইসোলেশনে যেতে চাইবেন না এবং এটিই স্বাভাবিক। তবে, আপনার নিজের ও আশপাশের মানুষের কথা বিবেচনা করে প্রয়োজনে সেলফ-আইসোলেশনে যেতে আপনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।