করোনা পৃথিবীর বুকে হঠাৎ উদয় হওয়া কোন ভাইরাস নয়

March 27, 2020 12:49 am

অনলাইন ডেক্সঃ

প্রশ্নঃ করোনা ভাইরাস কি ল্যাব মেইড???

প্রথমত, করোনা পৃথিবীর বুকে হঠাৎ উদয় হওয়া কোন ভাইরাস নয়, বরং আদিতেও এই ভাইরাস পৃথিবীর বুকে ছিল। ১৯৬০ সালে মুরগী থেকে এই ভাইরাসটি প্রথম সনাক্ত করেন গবেষকরা। মুরগীর ক্ষেত্রে এটিকে বলা হয় Avian coronavirus (IBV), এটাও এক ধরনের বার্ড ফ্লু এবং সেসময় মুরগীর মাংস ও ডিম দুটোইতে এই ভাইরাস ছিলো । এজন্য করোনা মহামারীর সময় মুরগীর মাংস ও ডিম না খাওয়ার পরামর্শ দেয় অনেক বিশেষজ্ঞ। যদিও এতে ডাইরেক্ট কোন কন্টাক্ট নেই এখন। তবে কেন বলা হয় তার প্রমাণ নিচে পাবেন। যাই হোক, পরে দুজন মানুষের সাধারণ ফ্লুতে এই ভাইরাস সনাক্ত করা হয়, যেটার নাম দেওয়া হয়েছিল Human coronavirus 229E!

সকল Corona viruses হলো Coronaviridae নামক ভাইরাস গোত্রের এক জাতীয় ভাইরাস। এই Corona virus এর আবার কয়েকটি উপশাখা আছে যেগুলোর কিছু সংক্রামিত করে প্রানীদের আর কিছু সংক্রামিত করে মানুষকে। human coronavirus 229E এবং human coronavirus OC43 – প্রথম এই দুটি করোনা মানুষের মধ্যে ফ্লু তৈরী করে। তবে মারাত্নক কোন উপসর্গ তৈরী করতে অক্ষম এই ভাইরাস দুটি। সাধারণ ফ্লু অর্থাৎ জ্বর, হাচি, কাশি হওয়ার পর রোগী সুস্হ হয়ে যায় কয়েকদিন পর।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের নভেম্বরে চীনে Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS) নামের নতুন একধরনের ফ্লুর আবির্ভাব হয় যাতে নিউমোনিয়া হয়ে মারা যায় রোগীরা। সেটি ছিল করোনা ভাইরাস ঘটিত প্রথম কোন মহামারী যা ৩০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল! SARS এর করোনা ভাইরাসের নামকরণ করা হয় Coronavirus type 4. SARS এর উপসর্গ কিন্তু বর্তমান করোনা এর ফ্লুর মতনই, তবে SARS এ ডাইরিয়া হয়েছিল কিছু রোগীর।

এরপর ২০০৩ এ বার্ডফ্লু মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এর ও উৎপত্তিস্থল চীন। এতে ইনফেক্টেড হয় ৮৬১ জন এবং মারা যায় ৪৫৫ জন। ফাটালিটি ৫৫%
এর সাইন্টিফিক কোড H5N1 Birdflu.

এটা আবার ফিরে আসে ২০১৩ তে। এর ও উৎপত্তি স্থল চীন। তখন আবার এতে ইনফেক্টেড হয় ১৫৬৮ জন এবং মারা যায় ৬১৬ জন।
এর সাইন্টিফিক কোড H7N9 Birdflu.

মিথ আছে বা ধারণা করা হয় কিছু কিছু বন্য প্রাণীতেও এইসব ভাইরাস সুপ্ত ছিলো দীর্ঘদিন এবং তা মানবদেহে পুনঃ প্রবেশ করে আরো বেশি শক্তিশালী রূপ নিয়ে!
ঐতিহ্যগত ভাবে চাইনিজরা বিভিন্ন পশু পাখির হাড় গোড় দিয়ে বিভিন্ন হার্বাল মেডিসিন বানায় আরো আগে থেকেই। পাশাপাশি তাদের বন্যপ্রাণী খাওয়ার ও প্রচলন আছে যাকে ইংরেজিতে বলে বুশ মিট।
এর মাঝে পিঁপড়ে খেকো প্যাঙ্গুলিন, বাদুড়, সিভিট নামের বুনো বিড়াল অন্যতম যাদের দেহে অনুরূপ সিন্ড্রোম দেখা গেছে ৭০ থেকে ৮০%….

তবে এইক্ষেত্রে ভিন্নমত ও আছে। শুধু পশুপাখি বা বুশমিট খায়নি এমন কিছু দেশে ও করোনা টাইপ বা ফ্লু টাইপ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।
যেমন– মালয়েশিয়া তে নিপাহ ভাইরাস, কঙ্গো লাইবেরিয়া ক্যামেরুনে তথা মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা, সৌদি আরবে MERS… ইত্যাদি।

ইবোলা প্রথম দেখা দেয় ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো তে ১৯৭৬ সালে। এতে ইনফেক্টেড হয়েছিলো ৩৩,৬৮৭ জন এবং মারা গিয়েছিল ১৪,৬৯৩ জন। এর ফাটালিটি রেইট ৪৪%…
শুধু ভাবুন তখন কঙ্গোর সাথে সারা বিশ্বের তখন এত যোগাযোগ ছিলো না! থাকলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতো কোটি কোটি মানুষ আর মারা পরতো কয়েক লাখ!
এটা আবার আউটব্রেক করে ২০১২/১৩ তে লাইবেরিয়ায়। কিন্তু দ্রুত সময়ে সাড়া দেয়ায় সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে নি।
ধারণা করা হয় এটা বাদুড় থেকে মানবদেহে প্রবেশ করে। যদিও আফ্রিকানদের বাদুড় খাওয়ার প্রচলন নেই।

এরপর মালয়েশিয়ায় নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে ১৯৯৯ তে! এতে ইনফেক্টেড হয় ৪৯৬ জন এবং মারা যায় ২৬৫ জন। ফাটালিটি রেইট ৫৫%…
ধারণা করা হয় এটা পাম বাগানে বাদুড় বা পেঁচা থেকে ছড়িয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে।

এরপর ২০১১/১২ সালের দিকে সৌদি আরবে MERS আউটব্রেক করে। স্বল্প কিছু প্রতিবেশী দেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় এর নাম হয় Middle East Respiratory Syndrome বা MERS.
এতে আক্রান্ত হয় ২৪৯৪ জন এবং মারা যায় ৮৫৮ জন।
ফাটালিটি রেইট ৩৫%.
এই ভাইরাস উট থেকে মানব শরিরে প্রবেশ করে। ইনফেক্টেড উটের মাংস খেয়ে মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

এর চেয়ে ও আশ্চর্যের বিষয় সুয়াইন ফ্লো তে মেক্সিকো এবং আমেরিকায় ২০০৯ এ আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় দশ লাখ মানুষ এবং মারা গিয়েছিল দেড় থেকে দুই লক্ষ মানুষ!!!!!!!!
কি হাইপার টাইপের নিউজ লাগছে??? জাস্ট গুগল ইট।
এখন প্রশ্ন বিশ্ব বাসী এটা জানে কি না? হ্যা জানে। কিন্তু আওয়াজ নাই।

শুধু এটা কেনো???
বৃটেনের ম্যাডকাউ ডিজিজের নাম শুনছেন??? যাতে লক্ষ লক্ষ ফার্ম কাউ স্লটার করা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। কারন এই ডিজিজ মানবদেহে প্রবেশের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো। একই অবস্থা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের খামারগুলোতেও ১৯৯৮/৯৯ এর দিকে।
তখন ঠিক কত শত বা হাজার লোক এতে ইনফেক্টেড হয়েছিলো তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারো কাছে।

এতগুলো বিশ্লেষণ দিলাম দুটো কারনে—
১) যারা ভাবেন করোনা ল্যাব মেইড তাদের জন্য।
২) যারা ভাবেন করোনা চাইনিজদের খাদ্যাভ্যাসের কারনে সৃষ্ট।

এরপরেও যাদের করোনা ল্যাব মেইড কি না — এটা নিয়ে সন্দেহ আছে, তাদের জন্য বিজনেস ইনসাইডার এবং নেচার সাইন্সের হাশিম আল গালিলি পেইজের দুটো ভিডিও দেয়া হলো কমেন্টে।

তবে প্রশ্ন থাকতে পারে, এখনও করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক ও টীকা তৈরী হয়নি ?

“This virus is highly mutated” এই একটি বাক্য যথেষ্ট এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে। যেসব ভাইরাস ক্ষণে ক্ষণে মিউটেশন হয়, সেসব ভাইরাসের প্রতিষেধক ও টীকা তৈরী দুরুহ। এরকম ভাইরাসের আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো HIV যেজন্য কয়েক দশক গেলেও AIDS প্রতিষেধক ও টীকা তৈরী হয়নি।

প্রশ্নঃ করোনা ভাইরাস কি গরম আবহাওয়ায় বা প্রচন্ড গরমে দুর্বল হয়ে যাবে?

করোনা ভাইরাস MERS ভাইরাস গোত্রের। যা সৌদির তপ্ত মরুভূমিতে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ও টিকে ছিলো এবং প্রাণ নিয়েছিলো ৮০০+ মানুষের।

আর বিশেষজ্ঞরা ও করোনার গরমে ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার কোন প্রমাণ পায়নি। অন্তত এই পর্যন্ত না।
তবে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় বলে মত প্রকাশ করেছে। কিন্তু ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রা প্রকৃতিতে থাকা মানেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়া।
তাই আপাতত গরমের দিনের উচ্চ তাপমাত্রা করোনা ধবংস করবে তা নিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকলে বিপদ।
তাছাড়া যেহেতু এটা হাইলি মিউটেটেড, তাই গরম আবহাওয়ায় এটা গরমকে রিডিং করে নিজেকে সেভাবে পরিবর্তন করে নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

উদাহরণ স্বরূপ সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার কথা বলা যায়। এইসব দেশ চির গ্রীষ্মের! আবহাওয়া অনেকটা আমাদের দেশের মতোই। সেসব দেশেও কিন্তু দ্রুত ছড়াচ্ছে। এমনকি কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পরে ও।

তবে তারপরেও আল্লাহ রহম করলে কতভাবেই করতে পারে।
কারণ ইতিহাস বলে মানুষ এবং ভাইরাসের যুদ্ধটা সুপ্রাচীন যেখানে মানুষ কখনো সম্পূর্ণ হার মানে নাই। হার মানলে মনুষ্য জাতি কবেই বিলুপ্ত হয়ে যেতো।

তবে ভবিষ্যতে কি হবে বলা যায় না। প্রকৃতির উপর আমাদের অকল্পনীয় অত্যাচারে আরো বহু প্রাণঘাতী ভাইরাসের সম্মুখীন আমরা হতে পারি।
অথবা আমাদের দেহের ন্যাচারাল ডিফেন্স সিস্টেম ( ইমিউনিটি সিস্টেম) সম্পূর্ণ কৃত্রিম বা দূর্বল হয়ে পড়ছে ক্রমাগত GMO জেনিটেক্যালি মোডিফাইড ফুড খেতে খেতে।
ফলে দেখা গেছে ভাইরাস প্রতিরোধ করার ন্যাচারাল শক্তির অভাবে আমরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আর পেরে উঠবো না।
হেরে যাবো একদিন…… হয়তো!!!

তাই কবির ভাষায় বলতে হয়, ” ফিরিয়ে দাও অরণ্য, লও হে নগর! ”

তথ্যসূত্র: নেচারস সাইন্স ম্যাগাজিন, হাশিম আল গালিলি ফেইসবুক পেইজ, গুগল, আল জাজিরা ইংলিশ, বিবিসি।

Please follow and like us: