১০ই এপ্রিল বাঙ্গালির ইতিহাসে ঐতাসিক দিন

April 11, 2020 8:17 am

নিউজ ডেক্সঃ

১০ ই এপ্রিল বাঙালির ইতিহাসে একটা ঐতিহাসিক দিন । এই দিনটা ১৯৭১ সনে যারা দেখেছে শুধু তারাই এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে । ২৫ শে মার্চ রাতে বাঙালীদের উপর পাকিস্তানী সৈন্যরা অতর্কিত হামলা চালায় । এই দেশটা তারা জোর করে দখল করে নেয় ।
নিরস্ত্র মানুষের উপর চালায় গুলি রামকৃষ্ণ মিশন রোড , ইত্তেফাক অফিস , বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরাণ ঢাকায় তাঁতী বাজারসহ সারা ঢাকায় পথে ঘাটে কুলি মজুর , রিকশাওয়ালা যাকে যেখানে পেয়েছে হত্যা করেছে । পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তাঁর বাড়িতে আক্রমন করা হয় । বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ এর বাড়িতে গুলি করতে করতে বাসায় প্রবেশ করে । তাজউদ্দীন সাহেবকে খুঁজে না পেয়ে বাসায় তাঁর ভাগ্নে তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী , হাসান মাহমুদ এবং ২য় তালার ভাড়াটিয়া প্রিন্সিপাল আজিজ বাগমার, বাসার কেয়ারটেকার শুক্কুর আলী ওরফে হাইয়ের বাপ সহ চার জনকে আটক করে নিয়ে যায় । ক্যান্টনমেন্টে টরচারিং ছেলে বন্দি করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।

পাকসেনারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ও পিলখানায় ই পি আর ব্যারাকে আক্রমন করে এবং ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈন্যদের অস্ত্র কেড়ে নেয় ।

সৈয়দা জোহুরা তাজউদ্দীন আজিজ বাগমারের স্ত্রীর আত্মীয়ের পরিচয় দিয়ে রেহাই পান । আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ এর সকল নেতৃবৃন্দ পালিয়ে যান । কেউ কেউ আটক হন আবার অনেককে হত্যা ও করেন । সারা ঢাকায় কার্ফু দেওয়া হয়।

সেই সময়ে সারা বাংলায় বিশেষ করে থানা সদরে মর্টার দিয়ে গুলি করত । হাট বাজার , বাড়িঘর এ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিত । মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে দৌড়িয়ে বনে জঙ্গলে পালিয়ে যেত । ২৬\২৭ তারিখ স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল কিন্তু কেউ শুনেছে , কেউ শুনেনি।

সারা বাংলার মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় এর মধ্যে পরে গেল । কোনো নেতার কোন বানী নেই ভাষণ নেই । পাকিস্তানি সৈন্যরা নিপীড়ন নির্যাতন করে যাচ্ছে এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ একদিন ১০ ই এপ্রিল রাত আট টায় আকাশ বানী কলকাতা কেন্দ্র থেকে দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় এর কণ্ঠে ভেসে আসল তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে। তখন এই অসহায় বাঙালিদের মনে একটা আশার আলো জ্বলে উঠলো।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটা রাষ্ট্র হতে হলে চারটি মূলনীতি থাকতে হবে- ১। নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ড ২। জনগণ ৩। সরকার ৪। সার্বভৌমত্ব । সাহারা মরুভূমি রাষ্ট্র হতে পারে না সেখানে জনগণ নেই । কাশ্মীর রাষ্ট্র হতে পারে না সেখানে সরকার নেই ।

বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ যে কাজটি করেছেন প্রথমেই সরকার গঠন করে মুক্তিবাহিনী গঠন করেছেন । পৃথিবীর সকল দেশের প্রতি বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের সরকারকে স্বীকৃতি আবেদন করেছেন । মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন । বাংলাদেশকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করেছেন। সরকারের অধীনে কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন , তিনি তাদের বেতন ভাতা দিয়েছেন। বাংলাদেশের মুদ্রা ছাপিয়েছেন।
বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় করেছেন। রণকৌশলে তিনি পাকিস্তানের তিরানব্বই হাজার সৈন্যকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছেন ।

আগস্ট মাস বর্ষাকাল বাংলাদেশে তখন বন্যা থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা আশা করেছিল পাক হানাদার বাহিনীর উপর চূড়ান্ত আঘাত হানা হবে কেননা সাধারণত পাকিস্তানী সৈন্যরা সাতার জানেনা।

আমি প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আগষ্টে চূড়ান্ত আঘাত হানা হয়নি কেন? তিনি বলেছিলেন সেনাবাহিনী ব্যারাকে থাকলে যুদ্ধে হটানো যায় না । যখন পাকসেনা বাহিনী থানায়, থানায় পাঠানো হলো তখন চারদিক থেকে ঢাকা আক্রমণ করা হলো । তখন নিয়াজী আত্মসমর্পণে বাধ্য হলেন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কমান্ডার লে: জে: অরোরার নিকট।

মুক্তিযুদ্ধে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকলেও তাঁর অবদান কম নয় । তিনি তাজউদ্দীন আহমদ গঠিত সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন । তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছিলেন । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বজ্র কণ্ঠে তাঁর বানী যুদ্ধের প্রেরণা যুগিয়েছে।

প্রথম দিকে কেউ কেউ এই সরকারের বিরোধীতা করেছেন। সরকার গঠনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ছিলনা বলে প্রচার করেছেন । তারা সরকার গঠন না করে বিপ্লবী কাউন্সিল করতে চেয়েছিল । এর মূল হোতা ছিল খন্দকার মোশতাক আহমেদ সহ কিছু ছাত্র নেতা, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত ই তাজউদ্দীন আহমদের গঠিত সরকারই বিশ্বের স্বীকৃতি পেল, এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হলো ।

১৯৭১ সনের আজকে ১০ ই এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছিল বলেই আজকে বাংলাদেশ স্বাধীন। জয়বাংলা ।

Please follow and like us: