চাপ বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের উপর

May 14, 2020 10:15 pm

নিউজ ডেক্সঃ

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গার্মেন্টস মালিক ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে মোবাইল ব্যাংকিং। কিন্তু এই সেবা পেতে গিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা নির্দেশনা, দফায় দফায় প্রজ্ঞাপন, ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও এজেন্টদের স্বেচ্ছাচারিতায় জট পেকে গেছে মোবাইল ব্যাংকিং সেক্টরে। এতে করোনাকালের দুর্যোগের এ সময়টায় বেশি বিপাকে পড়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ও মালিকরা।
করোনার কারণে তফসিলী ব্যাংকগুলো সীমিত পরিসরে খোলা থাকলেও গ্রাহকদের শারীরিকভারে উপস্থিত হয়ে লেনদেনে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহকরাও ঝুঁকেছেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। এরওপর করোনার এই সঙ্কটকালে বিভিন্ন কারখানা বিশেষ করে গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে।

সরকার রপ্তানিমুখি শিল্প বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা দিয়েছে চার শতাংশ সুদে ঋণের মাধ্যমে –তা শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য। এই বেতন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এজন্য গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংক হিসাব খুলতে বলা হয়। এরফলে এই হিসাব খুলতে একদিকে যেমন হিড়িক পড়ে যায়, তেমনি আবার এই বেতন ছাড় করতে গিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন বেড়ে যায় অনেক। ফলে অপারেটরদের সার্ভার সিস্টেমে লেগে যাচ্ছে জট, অন্যদিকে বেতনের টাকা তুলতে এজেন্টদের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গ্রাহক। এজেন্টরাও নগদ টাকা বিনিয়োগ করে গ্রাহকের টাকা প্রদান করতে পারছেন না । কারণ অপারেটর এবং এজেন্ট কারোই এতটা চাপ নেওয়ার মতো প্রযুক্তিগত প্রসার এবং জনবল বা এজেন্টদের নগদ টাকা কাছে রাখার প্রস্তুতি ছিল না। ফলে তাদেরও যেমন গলদঘর্ম অবস্থা তেমনি আবার ঈদ ঘনিয়ে আসায় টাকা তুলতে না পেরে শ্রমিকদের হা-হুতাশ। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও বেকায়দায়। শ্রমিকরা প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় নেমে বেতন পাচ্ছেন না বলে বিক্ষোভ করে তাদের দাবি জানাচ্ছেন।

মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, একসঙ্গে অনেকগুলো প্যাকেজ চালু হওয়ায় ব্যাপক চাপ বাড়ায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। সীমাবদ্ধতার কারণে কিছুটা বিলম্বে হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ। বেতন ভাতার জন্য প্রায় প্রতিদিনই শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। রাজধানীর আশুলিয়া, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর, ভাসানটেক, শাহআলী, তেজগাঁও, মতিঝিল এলাকায় শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।

করোনার কারণে অধিকাংশ শিল্প কারখানা বন্ধ থাকলেও জরুরি উৎপাদনে এখনও অনেক কারখানায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পোশাক শ্রমিকরা কাজ করছেন। উৎপাদন করা হচ্ছে মেডিক্যাল পোশাক পিপিই, মাস্কসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। এছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার অর্ডার সঠিক সময়ে শিপমেন্ট করতে অনেক গার্মেন্টস খোলা রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালিকদের লোকসান এড়াতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিপদের এ সময় শ্রমিকদের পাশে থাকতে মালিকরাও যথা সময়ে বেতন দিতে চান শ্রমিকদের। কিন্তু মোবাইল ব্যাংকিং জটিলতার কারণে সময় মতো বেতন পাচ্ছেন না শ্রমিকরা। এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিকাশের করপোরেট যোগাযোগ প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম আজকালের খবরকে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে অনেকেই দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত নম্বর চালু করছেন। অনেকেই নতুন হিসাব চালু করেছেন। এতে তাদের কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কারণ -আগের মতো বেশি পরিমাণে লোক সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। আগে যেখানে একদিনে কাজ করা সম্ভব হতো সেই কাজে এখন দুই থেকে তিনদিন লেগে যাচ্ছে। তবে তারা এই সংকট কাটাতে লোকবল বাড়িয়েছেন এবং জরুরি সেবা হিসেবে তারা যতো দ্রুত সম্ভব গ্রাহকদের সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান দেশের বৃহত্তম মোবাইল ব্যাংকিং অপরেটর বিকাশের এই কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে বিকাশের আরেকজন র্শীষ কর্মকর্তা জানান, গার্মেন্টস শ্রমিকরা যেন প্রণোদনার অর্থ পেয়ে তাদের প্রয়োজন অনুসারে ক্যাশআউট করতে পারেন সে লক্ষ্যে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সারাদেশের অধিকাংশ বিকাশ এজেন্ট পয়েন্ট সচল রাখতে কাজ করে যাচ্ছে বিকাশ। সীমিত ব্যাংকিং সময়, বিভিন্ন বিপনী বিতান বন্ধ, যানবহন সংকটের মত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে নগদ টাকা ও ডিজিটাল মানি সরবরাহ ঠিক রাখতে নিরলস কাজ করছে বিকাশ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সমস্যা হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম আজকালের খবরকে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সমস্যার ব্যাপারে এখনো কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। তবে যেসব ব্যাংক মোবাইল ব্যাংক সেবা দিচ্ছে তাদের সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুত সমস্যা সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আশ্বাস, সরকার ঘোষিত পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল থেকে মালিকদের দাবি মতো ঠিক সময়েই শ্রমিকের হাতে পৌঁছাবে এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ সার্কুলার অনুযায়ী, শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া বেতনের অর্থ ক্যাশ আউট করতে মোট খরচ পড়বে আট টাকা। যার চার টাকা কাটা হবে শ্রমিকের অ্যাকাউন্ট থেকে আর বাকি চার টাকা কাটা হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে। ব্যাংকে হিসাব জমা দেওয়ার শেষ তারিখে বাড়ানো হয় ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত নতুন করে হিসাব খুলেছেন প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সেবার গ্রাহকসংখ্যা ছিল সাত কোটি ৯৬ লাখ। এরমধ্যে সক্রিয় গ্রাহক তিন কোটি ৪৭ লাখ। আর দেশজুড়ে এ সেবা দিতে এজেন্ট রয়েছেন নয় লাখ ৭১ হাজার। ডিসেম্বরে দৈনিক লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, নভেম্বরে যা ছিল এক হাজার ২৬৩ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দিনে পাঁচবারে ৩০ হাজার টাকা জমা করা যায়। মাসে ২৫ বারে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা। আর এক দিনে ২৫ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসাবে পাঠানো যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাফল্য সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নে এককভাবে সব থেকে বেশি অবদান রাখার দাবিদার নিঃসন্দেহে বিকাশ এবং এর মূল সুফলভোগী এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। সেবাগ্রহীতারা কেউ রিকশা টানেন, কেউ গার্মেন্টকর্মী, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা উদীয়মান ই-কমার্স ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত। লাখ লাখ এজেন্টের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এই খাত। শহর থেকে টাকা যাচ্ছে গ্রামে মুহূর্তের মধ্যে নিরাপদে। মোবাইল ব্যাংকিং মানুষের সময় বাঁচায়, বিড়ম্বনা কমায়, নিজের টাকা নিজে তোলা বা খরচ করার জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয় না, কারও অনুকম্পার প্রয়োজন পড়ে না।
বাংলাদেশে এখন যে ১৬টি ব্যাংক মোবাইলে আর্থিক সেবা দিচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ, ডাচ্–বাংলার রকেট, ইসলামী ব্যাংকের এমক্যাশ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ইউক্যাশ, সাউথইস্ট ব্যাংকের টেলিক্যাশ, ওয়ান ব্যাংকের ওকে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাইক্যাশ, প্রাইম ব্যাংকের প্রাইমক্যাশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের স্পটক্যাশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের মোবাইল মানি, মেঘনা ব্যাংকের ট্যাপ এনপে। এ ছাড়া রুপালি, ফার্স্ট সিকিউরিটি, বাংলাদেশ কমার্স, এনসিসি ও যমুনা ব্যাংক দিচ্ছে শিওর ক্যাশ সেবা। এরমধ্যে মেঘনা ব্যাংকের সেবা বন্ধের পথে। আরও কয়েকটি ব্যাংক এমএফএস সেবা চালু করার পর আবার বন্ধও করে দিয়েছে।

Please follow and like us: