গণপরিবহণ বন্ধ : রাস্তা দাপাচ্ছে ভাড়ার গাড়ি

May 20, 2020 3:17 am

নিউজ ডেস্ক

করোনাভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতির কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলাকালে বাস-লঞ্চ-ট্রেন চলাচল বন্ধ এবং ঈদের আগে চারদিন ও ঈদের পর দুদিনসহ মোট সাতদিন জরুরি সেবা ছাড়া অন্য সব যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া হলেও রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রেন্ট-এ-কারের গাড়ি। ফলে সারাদেশ অঘোষিতভাবে লকডাউন রাখার যে লক্ষ্য নিয়ে গণপরিবহণ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে তা অনেকাংশেই ভেস্তে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ধরনের নিরাপত্তা না মেনে রেন্টে-এ-কারের গাড়িতে যেভাবে গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহণ করা হচ্ছে, তাতে যাত্রা পথে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে; তেমনি বিপুল সংখ্যক মানুষ স্থান বদলের কারণে এ মরণব্যাধি চারদিকে ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি এসব যানবাহন চালকদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার হারও বাড়ছে।

বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, এতদিন ভাড়ার গাড়ি এতটা রাস্তায় না থাকলেও ঈদকে সামনে রেখে তা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে এসব গাড়ি আটক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশ বিভিন্ন স্থান থেকে ভাড়ার গাড়ি ফেরত পাঠানো শুরু করেছে। তবে ব্যক্তিগত গাড়ি যেতে দেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যক্তিগত গাড়ি যেতে দেওয়ার নির্দেশনার সুযোগটিই মাঠপর্যায়ের পুলিশ কাজে লাগাচ্ছে। তারা ভাড়ার গাড়ি চালক ও যাত্রীদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে তা ব্যক্তিগত গাড়ি দেখিয়ে বিভিন্ন চেকপোস্ট থেকে ছেড়ে দিচ্ছে।

তবে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভাড়ার গাড়ি আটক কিংবা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত কোনো নির্দেশনা পাননি। এ কারণে তা কড়াকড়িভাবে পালন করতে পারছেন না। এছাড়া যে লক্ষ্য নিয়ে গণপরিবহণ বন্ধ রাখা হয়েছে, সে পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত গাড়ি যেতে দেওয়ার সুযোগ এবং ভাড়ার গাড়ি আটক কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২৬ এপ্রিল গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কয়েকজন মিলে রেন্ট-এ-কারের মাইক্রোবাস কিংবা কার ভাড়া করে কর্মস্থলে ছুটে এসেছেন। তাদের পালা শেষ না হতেই আবার ১০ মে থেকে মার্কেট-শপিংমল খুলে দেওয়ার খবর শুনে দোকান কর্মচারীসহ মার্কেটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ একই কায়দায় শহরে আসতে শুরু করেন। তবে ঈদ বেচাকেনা জমে না ওঠায় এবং বেশকিছু মার্কেট না খোলায় দোকান কর্মচারীদের আবার হুড়োহুড়ি করে বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে। এছাড়া ঈদের আগে যানবাহন চলাচলে কড়াকড়ি হবে সরকারের এমন আগাম ঘোষণায় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে অনেকে এখন আগেভাগেই গ্রামে ফিরতে শুরু করেছে। আর সবার যাতায়াতের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে রেন্ট-এ-কার গাড়ি। এছাড়া মালবাহী ফিরতি ট্রাক-মিনি ট্রাক ও কভার্ড ভ্যানেও বেশকিছু মানুষ সাওয়ার হচ্ছেন। অনেকে আবার লেগুনা, মোটরসাইকেল ও উবারের অফলাইনের গাড়িতে করে বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটছেন।

পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন কত সংখ্যক মানুষ রেন্ট-এ-কারের গাড়ি এবং মালবাহী ট্রাক-কভার্ড ভ্যানে বাড়ি ফিরছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে এ সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজারের নিচে নয়। রেন্টে-এ-কারের প্রায় ১৫ হাজার মাইক্রোবাস-কার প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে ট্রিপ দিচ্ছে।

রাজধানীর রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ীরা জানান, হাই-এস ও নোহা-সহ যেসব মাইক্রোবাসের আসন সংখ্যা ৯-১০ এর ঊর্ধ্বে এসব গাড়ির চাহিদাই এখন সবচেয়ে বেশি। গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত মাইক্রোবাসের জোগান দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। মাইক্রোবাস না পাওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে কারও ভাড়া করছে। বিগত সময় পরিবারের সদস্যরা ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়ি ভাড়া করলেও সে চিত্র পাল্টেছে জানিয়ে একজন গাড়ি চালক জানান, এখন বেশিরভাগ যাত্রীই একে অপরের অপরিচিত। এমনকি অনেকের গন্তব্যও একই স্থান নয়। একই রুটের ১০-১২ জন যাত্রী মিলে মাইক্রোবাস ভাড়া করে তারা নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছে। এতে কে করোনায় আক্রান্ত, আর কে আক্রান্ত নয় তা বোঝার কোনো সুযোগ থাকছে না।

এদিকে চাহিদার তুলনায় রেন্টে-এ-কারে নিয়মিত ভাড়াখাটা গাড়ির সংখ্যা কম হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উচ্চ ভাড়ার টোপ দিয়ে পরিচিতজনদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের মাইক্রোবাসও কাজে লাগাচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ সময় ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত ১২ আসনের হাই-এস মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া গেলেও এখন সেখানে নূ্যনতম ৮ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। একই ধরনের মাইক্রোবাসে ঢাকা থেকে যশোর যেতে যাত্রীদের মাথাপিছু এক হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। ১২ আসনের মাইক্রোবাসে ১৫ থেকে ১৬ জন যাত্রী অহরহই পরিবহণ করা হচ্ছে।

উচ্চ ভাড়া আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও এতে তাদের তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না বলে দাবি করেন রেন্ট-এ-কারের মালিকরা। তাদের অভিযোগ, অঘোষিত লকডাউনে যানবাহন চলাচলের নিষেধাজ্ঞার কথা বলে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি ট্রাফিক ও থানা পুলিশ তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করছে। ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত যেতে অন্তত ৮টি পয়েন্টে হাইওয়ে-ট্রাফিক ও থানা পুলিশকে মাইক্রোবাস প্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। চাঁদা না দিলে তাদের মাইক্রোবাস ও অন্যান্য ভাড়ার গাড়ি আটকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন তারা।

এদিকে আন্তঃজেলা পরিবহণের মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, করোনা পরিস্থিতির কারণে বাস-মিনিবাস চলাচল বন্ধ করা হলেও যাত্রীদের আসা-যাওয়া অনেকটা আগের মতোই রয়েছে। তাদের ভাষ্য, গণপরিবহণ বন্ধ রেখে কৌশলে রেন্ট-এ-কারের গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে যুক্তি তুলে ধরে তারা বলেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং শিমুলিয়া ও কাঁঠালিয়া ঘাটে প্রতিদিন কত সংখ্যক কার-মাইক্রোবাস প্রতিদিন পার হচ্ছে তা হিসাব করলেই জানা যাবে।

অভিযোগের সুরে একাধিক গণপরিবহণ মালিক এ প্রতিবেদককে বলেন, গণপরিবহণ বন্ধ রেখে অঘোষিত লকডাউনের মাধ্যমে যদি সাধারণ মানুষকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত ঠেকানোই সরকারের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে যানবাহন পারাপারের জন্য ঘাটে অতিরিক্ত ফেরি কেন চালু করা হয়েছে? গণপরিবহণ মালিকদের ভাষ্য, শুধু পণ্যবাহী যানবাহন ও জরুরি প্রয়োজনে চলাচল গাড়ি পার করার জন্য যে সংখ্যক ফেরি চালু রাখা প্রয়োজন, বর্তমানে তার দ্বিগুণের বেশি ফেরি চালু রাখা হয়েছে। ভাড়ার মাইক্রোবাস-কারসহ ব্যক্তিগত ব্যবহৃত অন্যান্য যান পারাপারের জন্যই এ উদ্যোগ বলে অভিযোগ করেন গণপরিবহণ মালিকরা।

তাদের এ অভিযোগ যে অমূলক নয়, তা ফেরিঘাট এলাকার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা জানান, প্রতিটি ফেরিতে ৫টি পণ্যবাহী যান পার হলে এর সঙ্গে অন্তত ১০টি মাইক্রোবাস এবং ১৫টি কার পার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা লকডাউন এবং জরুরি যানবাহন ছাড়া অন্য গাড়ি রাস্তায় চলাচল নিষিদ্ধ হলে ব্যক্তিগত ও রেন্টে-এ-কারের গাড়ি কীভাবে ফেরিতে পার করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্থানীয়রা।

এদিকে এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিরা অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সেতুমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের বলেন, ঈদকে সামনে রেখে মানুষের শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার প্রবণতা করোনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তিনি ফেরিঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ভিড় করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রকারান্তরে নিজেদের এবং চারপাশের মানুষের জীবনের গভীর অমানিশা ডেকে আনবেন। এভাবে চলতে থাকলে দুর্যোগের অন্ধকারাচ্ছন্ন অতিক্রমের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে বিলম্বিত বোধদয়ের পর অতিসম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে রাজধানীর বাইরে থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক ও জরুরি সেবার যানবাহন ভিন্ন অন্য কোনো গাড়ি প্রবেশ এবং ঢাকা থেকে কোনো গাড়ি বাইরে না যাওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও তা রেন্টে-এ-কার চলাচলের ক্ষেত্রে বড় কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপরিবহণ শ্রমিকরা জানান, এর আগেও ডিএমপির পক্ষ থেকে ঢাকার প্রবেশমুখগুলো যানবাহন আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। তখন রেন্টে-এ-কারের বিপুল সংখ্যক গাড়ি টহলরত পুলিশকে উৎকোচ দিয়ে চেকপোস্ট পার হয়ে গেছে। আবার কখনো কখনো নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রেন্টে-এ-কারের এক গাড়ি যাত্রী সংগ্রহ করে তাদের গাবতলী পৌঁছে দিয়েছে। পরে সেখান থেকে ওই যাত্রীর হেঁটে চেকপোস্ট পার হয়ে প্রবেশমুখের অপরপ্রান্তে থাকা অন্য মাইক্রোবাসে চড়ে গন্তব্যে রওনা দিয়েছে।

রাজধানীসহ সারাদেশে রেন্ট-এ-কারের ১৫ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করছে। অথচ এদের কোনো রুট পারমিট নেই। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা নিয়মিত মাসোহারা পাওয়ায় উদাসীন তারা বরাবরই এ ব্যাপারে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তারা একে অন্যের ওপর দায় চাপান। অন্যদিকে যানবাহন ভাড়া দেওয়ায় জড়িতরা বলছেন, অবৈধ জেনেও তারা ব্যবসা করছেন বেঁচে থাকার তাগিদে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যক্তির নামে নিবন্ধন করা যানবাহন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা অবৈধ। তবে এর পরও কাজটি চলছে ‘অন্যভাবে’। যদিও এ অন্যভাবেটা কেমন তা কেউই স্পষ্ট করেন না।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে রেন্ট এ কার হিসেবে ভাড়ায় চালিত গাড়িগুলো অবৈধ। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও কিছু আইনি জটিলতার কারণে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে না।

Please follow and like us: