ফতুল্লা জুড়ে লিকেজ গ্যাস পাইপ, দূর্ঘটনা ছাড়া নজরে আসেনা তিতাস কর্তৃপক্ষের!

June 2, 2020 9:29 pm

তুষার আহমেদ :

গত ২৫ মে ঈদের রাত, সারাদিন ঈদের নানা আয়োজন ও ধকল কাটিয়ে অন্যান্যদের মত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানাধীন দক্ষিন সেহাচর এলাকার বাসিন্দারাও। কিন্তু সেদিনের ঘুম আর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি কারোর। ঘড়ির কাটায় রাত যখন ১২টা, ঠিক তখনই হঠাৎ রাস্তা থেকে ভেসে আসে বিকট শব্দ।

ঘর থেকে বাইরে বের হতেই চোখে পড়ে, গ্যাস পাইপ লিকেজ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড! ততক্ষনে রাস্তার দু’পাশের পয়নিস্কাশনের ড্রেনে গ্যাসের তীব্রতার সাথে দাও দাও করে জ¦লছে আগুন। কোন হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও দূর্ঘটনা এড়াতে মুহুর্তেই ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেড়িয়ে আসে আতঙ্কিত মানুষেরা।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট। প্রায় ঘন্টা খানেক প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার ফাইটাররা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে রাতেই ছুটে আসেন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী ফতুল্লা জোনের কর্মকর্তাগণও।

সরেজমিনে দেখা যায়, দূর্ঘটনাস্থল এলাকার গ্যাস লিকেজের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষে ঈদের ২য় দিন থেকেই কাজে নেমেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। তবে, ১০ ইঞ্চি আর.সি.সি ঢালাই সড়কের আরো প্রায় ১০ ফুট গভীরে গ্যাস পাইপের অবস্থান থাকায় সংস্কার কাজে অতিরিক্ত সময়ের পাশাপাশি অধিক পরিশ্রম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিতাস কর্তৃপক্ষ। তাই ঘটনার পাঁচদিন পেড়িয়ে গেলেও এখনও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা যায়নি। ফলে গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকান্ডের ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়েই দিনাতিপাত করছে ওই এলাকার মানুষগুলো।

সরেজমিনে আরো দেখা যায়, গ্যাস পাইপ লিকেজ শুধু দক্ষিন সেহাচর এলাকাতেই নয়, গোটা ফতুল্লা থানা এলাকা জুড়েই এই লিকেজ সমস্যা বিরাজমান। বছরের পর বছর ধরে গ্যাস পাইপ ও রাইজারের লিকেজ থেকে গ্যাস বের হলেও কোন দূর্ঘটনা ছাড়া এতে নজর পড়েনা তিতাস কর্তৃপক্ষের। আবার নিজ নিজ বাড়ি ওয়ালারা যেনে বুঝেও নিচ্ছেন না কোন কার্যকরী পদক্ষেপ।

এদিকে ঈদ কিংবা যেকোন বর্ধিত ছুটির দিন গুলোতে মিল ফ্যাক্টরী বন্ধ থাকায় বাসা বাড়ির লাইনে গ্যাসের প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়। অন্যান্য দিনের তুলনায় গ্যাস লিকেজের পরিমানও বৃদ্ধি পায় বহুগুণে। ফলে ঘটে চলেছে একের পর এক দূর্ঘটনা। তাই দ্রæত গ্যাস পাইপের লিকেজ গুলো সংস্কার করা না গেলে হয়তো অচিরেই আরো ভয়াবহ দূর্ঘটনার কবলে পরতে পারে ফতুল্লাবাসি। ঘটতে পারে একাধিক প্রাণহানীর ঘটনাও। এমনটাই আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এ প্রসঙ্গে ফতুল্লার দক্ষিন সেহাচর এলাকার বাসিন্দা মোঃ সুজন বলেন, বিগত প্রায় ৩৫ বছর পূর্বে আমাদের এলাকায় গ্যাসের লাইন আনা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, এই দীর্ঘ সময় পাইপ গুলো মাটির নিচে থাকায় হয়তো বিভিন্ন স্থানে জং ধরেছে। আবার গ্যাস পাইপেও হয়তো সঠিক ভাবে স্কচটেপ পেঁচানো হয়নি। তাই লিকেজ তৈরী হয়ে গ্যাস বের হচ্ছে। ঈদে মিল ফ্যাক্টরী বন্ধ থাকায় গ্যাসের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার মাঝে গ্যাসের পাইপ থাকলেও রাস্তাটি আরসিসি ঢালাই হওয়ায় গ্যাস সরাসরি রাস্তা দিয়ে বেড় হচ্ছে না। গ্যাসের এতোটাই চাপ যে, মাটির নিচে দু’পাশের পয়নিস্কাশনের ড্রেন দিয়ে গ্যাস নির্গত হচ্ছে। কেউ হয়তো ধুমপান করে সিগারেটের আগুন ড্রেনে ফেলায় এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটল। এই সমস্যা শুধু দক্ষিন সেহাচর এলাকাতেই নয়, গোটা ফতুল্লা থানা এলাকাতেই গ্যাস লিকেজের সমস্যা রয়েছে। এই পাইপ গুলো দ্রæত সময়ের মধ্যে সংস্কার করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে যেকোন সময়ে আরো ভয়াবহ দূর্ঘটনা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের প্রাণহানী ঘটারও সম্ভাব না রয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ দরকার।

একই এলাকার মোঃ আক্তার হোসেন বলেন, প্রায় ৩-৪ বছর হলো এই এলাকার প্রধান সড়ক আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে। কিন্তু এর আগে থেকেই এখানে ভয়াবহ আকারে গ্যাস লিক হচ্ছে। বিশেষ করে আরসিসি ঢালাইয়ের পূর্বে এই সড়কটি যখন বেহাল অবস্থায় ছিলো, তখন বৃষ্টির পানি জমলে দেখা যেত প্রচুর বেগে গ্যাস বের হচ্ছে। রাস্তায় গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো। বেশ কয়েকবার ছোট ছোট অগ্নিকান্ডও ঘটেছিলো। কিন্তু তা সংস্কার করা হয়নি। উল্টো গ্যাস পাইপ সংস্কার না করে স্থায়ী ভাবে আর.সি.সি ঢালাইয়ের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কার করা হলো। এখন এই গ্যাসের পাইপ সংস্কার বা পরিবর্তন করতে গেলে পুরো রাস্তাই খুড়তে হবে।

তিনি আরো বলেন, এলজিইডি ও তিতাসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। কোন পরিকল্পনা ছাড়াই রাস্তার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এখন গ্যাসের পাইস সংস্কারের প্রয়োজন হওয়ায় দেখা যাচ্ছে, মাত্র ২-৩ বছরের মাথায় আর.সি.সি ঢালাই রাস্তাটি খুরতে হবে। গ্যাসের পাইপ রাস্তার মাঝামাঝি হওয়ায় তা সংস্কার করতে গেলে পুরো রাস্তাটিই খুড়া ছাড়া বিকল্প কোন পথও নেই। বহু বছর এই সড়কটি অবহেলিত থাকার পর স্থায়ী ভাবে আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে সড়কটি উন্নত করা হয়েছে। এবার গ্যাস সংস্কারের জন্য সড়কটি কাটা হলে আবার কবে তা সংস্কার করা হবে কে জানে?

তিতাসের ডেমরা সিস্টেম অপারেশন দক্ষিন এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘গ্যাস লিকেজ থেকে অগ্নিকান্ডের খবর পেয়েই আমরা এখানে ছুটে এসেছি। আরসিসি ঢালাই সড়কের মাঝামাঝি গ্যাসের পাইপ থাকায় কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। ঈদের মধ্যে অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীরা ছুটিতে থাকলেও করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে স্বল্প লোকবল নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছি। এখানে স্থায়ী সমাধানের লক্ষে কাজ করতে হবে। তাই একটু সময় লাগবে।’

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী ফতুল্লা জোবিও’র সুপার ভাইজার মোঃ মনিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, অগ্নিকান্ডের সংবাদ পেয়ে রাতেই আমরা এখানে ছুটে এসেছি। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটও সাহসের সাথে প্রচেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আমরা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষে কাজ করছি। যাতে পূনরায় দূর্ঘটনা না ঘটে। ঈদ ও করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন লেবার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। আরসিসি ঢালাই রাস্তার নিচে পাইপ থাকায় এই সমস্যা এখন ভোগান্তিতে রূপ নিয়েছে। এলজিইডি আমাদের সাথে সমন্বয় না করেই রাস্তার কাজ করে যার মধ্যে মিল কারখানা আমরা কৌশলের সাথে কাজ করে যাচ্ছি।

Please follow and like us: