ভুলতার চার লেন ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লেগেছে ৫ বছর

July 5, 2020 11:01 am

নিউজ ডেক্সঃ

নির্ধারিত সময়ে উন্নয়ন প্রকল্প শেষ না করাটাই এখন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন নেওয়ার পর সেটি আর অনুমোদিত মেয়াদে শেষ করা হয় না। ফলে খরচ বাড়ে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় চার লেন ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটি শেষ করতে পাঁচ বছর বাড়তি সময় লাগছে, যা ২০১৫ সালের জুনে শেষ করার কথা ছিল।

প্রায় ২৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির খরচ এখন ৩৫৩ কোটি ২৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সংশোধিত মেয়াদে শেষ করার আশ্বাস সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) দিলেও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এটাতে সংশয় প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবনার তথ্য থেকে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়কের (এন-২) ২৫তম কিলোমিটার পয়েন্টে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় ঢাকা বাইপাস জাতীয় মহাসড়ক (এন-১০৫) আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করেছে। বতর্মানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ হাজার যানবাহন ও ঢাকা বাইপাস সড়কে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এই বিপুল যানবাহন ভুলতা বাজার এলাকা দিয়ে চলাচলের কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

এছাড়া পূর্বাচল নতুন উপশহরে যাতায়াতের কারণে ভবিষ্যতে যানজট আরও বৃদ্ধি পাবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভুলতায় চার লেন ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৩ সালে। উদ্দেশ্য ভুলতা ইন্টারসেকশন এলাকায় ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়ক এবং ঢাকা বাইপাস জাতীয় মহাসড়কের (এন-১০৫) যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং রাজধানীর সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশেষত সিলেট বিভাগের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করা।

২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর একনেক থেকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করে প্রকল্প খরচ ২৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকায় আবার অনুমোদন দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। মেয়াদ বাড়ানো হয় দুবছর। তাতেও প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি সওজ। ২০১৮ সালের জুনে একনেক থেকে ব্যয় ৩৫৩ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বাড়িয়ে মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে আবারও প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতেও প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এখন মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কাছে। বলা হয়েছে, আন্তঃঅঙ্গ ব্যয় সমন্বয় ও খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক কোড সংশোধনের, যা সেতুমন্ত্রী ২৭ জানুয়ারি অনুমোদন দিয়েছেন।

প্রকল্পের কাজগুলো হচ্ছে- এক হাজার ৯৩ মিটার মেইন ফ্লাইওভার, ৭৫৭ মিটার র‌্যাম্প, ২ হাজার ৫০ মিটার ড্রেন নির্মাণ, তিনটি ইন্টারসেকশন ডেভেলপমেন্ট, সড়ক বাঁধে মাটির কাজ, ৩.২২ কিলোমিটার পেভমেন্ট প্রশস্তকরণ ও পুনঃনির্মাণ, ১.১ কিলোমিটার পেভমেন্ট রি-সার্ফেসিং, ১.২ কিলোমিটার ফুটপাথ এবং রেলিং নির্মাণ, ১৪.১ মিটার আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, রক্ষাপ্রদ কাজ ইত্যাদি।

সওজের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেভমেন্ট প্রশস্তকরণ ও পুনঃনির্মাণে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা কমেছে, ভ্যাট ও ট্যাক্স খাতে হার বৃদ্ধিতে এই খাতে খরচ ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। মেইন ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রায় ৯৪ লাখ টাকা ব্যয় বেড়েছে। রোড মার্কিং খাতে ২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং ইলেক্ট্রিফিকেশন খাতে ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। গত মে পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯৬ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি বা খরচ হয়েছে ৩১২ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৮৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২ বছরের প্রকল্প সময় বাড়িয়ে সাত বছরে ৯৬ শতাংশ করেছে। এখানে প্রতি মাসে গড়ে কাজ হয়েছে ১.১৪ শতাংশ। সেখানে ৪ শতাংশ বাকি কাজ করতে আরো কয়েক মাস লাগবে। মূলত তদারকির অভাবেই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি কমে যায়। এদিকে বছর পেরোলেও কোন অগ্রগতি নেই দেশের ১২১টি উন্নয়ন প্রকল্পের। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলেও বিভিন্ন কারণে এডিপির ১২১টি প্রকল্পের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোন অগ্রগতি হয়নি। পুরো একটি বছর এই প্রকল্পগুলো কোন ব্যয় করতে পারেনি। এদিকে অনুমোদন নিয়ে প্রকল্পের কাজ না করতে পারায় সময় পেরোলেই বাড়ছে প্রকল্পের মেয়াদ এবং ব্যয়ের পরিমাণ।

এদিকে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং বারবার সংশোধনের সংস্কৃতির অবসান হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এসব প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি প্রকল্প, দেশের তিনটি বিমানবন্দরের উন্নয়ন, রেলের উন্নয়ন, ডিপিডিসি এলাকায় বিদ্যুৎ সিস্টেম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার প্রকল্পও রয়েছে। আবার এক হাজার ১৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও শতাধিক প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা একটি টাকাও খরচ করতে পারেনি। ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা কম আছে ৩৪টির। অথচ অনেক উন্নয়ন প্রকল্প টাকার অভাবে নির্ধারিত মেয়াদে সমাপ্ত করা যায় না।

উন্নয়ন কার্যক্রম বছরের পর বছর চলমান থাকার কারণ সম্পর্কে আইএমইডির পর্যবেক্ষণ হলো, যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ ও ব্যয় প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অথচ বিনিয়োগ প্রকল্পের ব্যয় ২৫ কোটি টাকার বেশি হলেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সার্বিক পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয় না। পাশাপাশি বেজলাইন ডাটা সংরক্ষণ ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্য দিকে, বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার নানা রকম শর্ত অনেকসময় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সাথে বাস্তবায়নকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতাও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দক্ষ জনবল না থাকায় প্রকল্প সমাপ্তির পরে প্রায়ই বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সেবা ক্রয় চুক্তি করতে হয়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।

Please follow and like us: