দেশের একমাত্র সরকারি স্যালাইন উৎপাদন কারখানা বন্ধ

July 11, 2020 11:04 am

হেডলাইন্স ডেক্সঃ

আইপিএইচ’র স্যালাইন ও ব্লাডব্যাগ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে আইপিএইচ’র জৈব ওষুধ উৎপাদন লাইসেন্সও (নং-১৭৭) সাময়িক বাতিল করা হয়েছে। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

পাশাপাশি বন্ধ হয়েছে ব্লাডব্যাগ ও ইনফিউশন সেট উৎপাদন। এতে মৃত্যুপথযাত্রীদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড উৎপাদনও বন্ধ আছে। দেশের কোনো ওষুধ কোম্পানির এটি উৎপাদন ও আমদানির অনুমতিও নেই।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল মৃত্যুপথযাত্রীকে বাঁচানোর শেষ অবলম্বনও। গুড ম্যানুফ্যাক্সারিং প্রাকটিস (জিএমপি) নীতিমালা অনুসরণ না হওয়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর গত ১৪ জুন থেকে এটা বন্ধ করে দিয়েছে।

সরকারি পর্যায়ে দেশের একমাত্র স্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট (আইপিএইচ)। এখানে জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন আইভি ফ্লুইড (ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড), স্যালাইন, ব্লাডব্যাগ ও রিয়েজেন্ট উৎপাদন করা হয়। এসব স্যালাইন দেশের সব সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে। এসবের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের অভাবে জটিল করোনা রোগীসহ অন্য সব রোগী সাধারণ চিকিৎসাবঞ্চিত হবেন- এমন শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে বলা হয়েছে, অধিদফতরের একটি পরিদর্শক দল ২০১৯ সালের ১৪ আগস্ট তারিখে আইপিএইচ’র আইভি ফ্লুইড ইউনিট পরিদর্শন করে। পরিদর্শক দল আইপিএইচে উৎপাদিত ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনের আলোকে আইপিএইচকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নোটিশের কোনো জবাব দেয়নি।

স্মারকে বলা হয়, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, আইভি ফ্লুইড উৎপাদন প্লান্টটি জরাজীর্ণ এবং জিএমপি গাইডলাইন অনুযায়ী মানসম্পন্ন স্যালাইন উৎপাদনে সক্ষম নয়।

তাই ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সেটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ওই কারখানায় ওষুধ উৎপাদন ও মান নিশ্চিতের জন্য প্রিমিসেস, মেশিনারি, যন্ত্রপাতি, ইকুইপমেন্টস এবং দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। যা ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ১৫(১) ধারা লঙ্ঘন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাক্সারিং প্রাকটিস (জিএমপি) নীতিমালার পরিপন্থী।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইপিএইচ’র একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতির পিতার প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান বন্ধের পাঁয়তারা শুরু করে সরকারি-বেসরকারি একটি চক্র। দুটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি আইভি ফ্লুইড উৎপাদন ইউনিট চালু করাতেই এই তৎপরতা। একইভাবে ২০১১ সালে আইপিএইচ’র নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিন উৎপাদন ইউনিট বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানে ওই দুটি কোম্পানির একটি এই ব্যবসা করছে। তবে সরকারি ভ্যাকসিনের মূল্য ছিল ৪০ টাকা আর বেসরকারি ভ্যাকসিন বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ টাকায়।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে স্যালাইনের চাহিদাপত্র আসছে। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগীদের প্রয়োজনীয় সব স্যালাইন কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে কারও যদি ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইডের প্রয়োজন হয় সেটি কেউই সরবরাহ করতে পারবে না। ফলে অনেক মূল্যবান জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আইপিএইচ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি ব্যাগ নরমাল স্যালাইন উৎপাদন মূল্য ২৫ টাকা। দেশের বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলো এই স্যালাইন বিক্রি করে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জন্য ব্যবহৃত ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড আইপিএইচ সরবরাহ করে ৪২ টাকায়। এটি বেসরকারি কোনো ওষুধ কোম্পানির উৎপাদনের অনুমতি নেই। তবে উৎপাদনের অনুমোদন পেলে প্রতি প্যাক বাজারে বিক্রি হবে কমপক্ষে এক হাজার থেকে ১৫শ’ টাকায়।

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের রোগ নির্ণয়ের জন্য ২১ ধরনের রিয়েজেন্ট তৈরি করে আইপিএইচ। এর মধ্যে রয়েছে বেনেডিক্টস সলিউশন, ইএসআর ফ্লুইড, ২০% সালফিউরিক এসিড, এন/১০ হাইড্রোক্লোরিক এসিড, এসেটোন-অ্যালকোহল, ৫% এসিটিক এসিড, ডব্লিউবিসি ফ্লুইড, আরবিসি ফ্লুইড, ২০% সোডিয়াম হাইড্রোক্সাই সলিউশন, সেমেন্স এনালাইসিস ফ্লুইড, নরমাল স্যালাইন, মেথিউলিন ব্লু, ক্রিস্টাল ভায়োলেট, কার্বোল ফুসসিন, গ্রাম লোডিনে, লুগোল’স লোডিনে, লেসিহম্যান স্টেইন, জিমেসা স্টেইন, বিলোরিবন কিট, ক্রিয়েটিনন কিট এবং ইডিটিএ ভায়েল।

জানতে চাইলে আইপিএইচ’র সাবেক পরিচালক ডা. জাফরউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আইপিএইচ’র স্যালাইনের মান প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত স্যালাইন দেশের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আসছে। এটি বন্ধ হয়ে গেলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনলে তিনি অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

এদিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর চলতি বছরের ২ এপ্রিল এক স্মারকে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের বর্তমান পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় আইভি ফ্লুইড, ব্লাডব্যাগ ও খাবার স্যালাইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে মহামারী চলাকালীন সময়ে অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সামগ্রী হিসেবে সরকারি হাসপাতালে আইভি ফ্লুইড, ব্লাডব্যাগ ও খাবার স্যালাইন সরবরাহ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ওই স্মারকে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে সরকারিভাবে দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে স্বল্পমূল্যে সরবরাহের উদ্দেশ্যে আইভি ফ্লুইড ও ব্লাডব্যাগ কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৬শ’ কোটি টাকা মূল্যমানের মেশিনারিজ ও দক্ষ জনবল বিদ্যমান।

প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কি পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাইলে ডা. মুহাম্মদ আবদুর রহিম যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিষয়টি বিবেচনার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে আবারও চিঠি দেব। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকলে দেশের সাধারণ মানুষ স্যালাইন ব্যবহারের সক্ষমতা হারাবে।

৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে যে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আইপিএইচকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এটিকে আধুনিকায়ন করতে হবে। কিন্তু এখানে স্যালাইন উৎপাদনের দরকার নেই। বিকল্প উৎস হিসেবে তিনি সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইডিসিএল’র নাম উল্লেখ করে বলেন, আজকের সভার উদ্দেশ্য স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ করা নয়, কিভাবে উৎপাদন স্থানান্তর করা যায় সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

এ সময় প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন পরিচালক ডা. সুলতান মো. শামসুজ্জামান আইপিএইচ’র সামগ্রিক অবস্থান তুলে ধরে বলেন, আইপিএইচ-এ ৫টি পৃথক ল্যাব, দুটি ইউনিট রয়েছে। এখানে আইভি ফ্লুইড, ব্লাডব্যাগ, ইনফিউশন সেট, ট্রান্সফিউশন সেট, ডায়াগনস্টিক রিয়েজেন্ট এবং ওআরএস উৎপাদন করা হয়। এছাড়া দেশে সরকারি একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৩ শতাংশ সোডিয়া ক্লোরাইড সলিউশন উৎপাদন করে আইপিএইচ।

পাশাপাশি গ্লুকোজ স্যালাইন, গ্লুকোজ অ্যাকোয়া, নরমাল স্যালাইন, কলেরা স্যালাইন, পিডি ফ্লুইড, বেবি স্যালাইন, হার্টম্যান সলিউশন ইত্যাদি স্যালাইন উৎপাদন করা হয়। যা স্বল্পমূল্যে সরকারি হাসপাতালে বিতরণ করা হয়। এছাড়া আইপিএইচ ২৩ প্রকার ডায়াগনস্টিক রিয়েজেন্ট উৎপাদন সারা দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে বিতরণ করে। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে গণপূর্ত বিভাগ আইভি ফ্লুইড উৎপাদন ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। তবে নতুন ভবন না হওয়া পর্যন্ত ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলে অস্থায়ী স্থাপনার মাধ্যমে জিএমপি অনুসরণ করে স্যালাইন উৎপাদন সম্ভব।

সভায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শাহ মনির হোসেন বলেন, সরকারিভাবে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ করে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া সমীচীন হবে না। আইপিএইচ সে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে। একই মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার, ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইপিএইচ’র উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে মত দেন।

তবে ওই সভায় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০০৩ সাল থেকে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের আইভি ফ্লুইড ইউনিট পরিদর্শন করা হয়। সেখানে এটি তৈরির মতো কোনো পরিবেশ নেই, মান নিয়ন্ত্রণে নেই দক্ষ জনবল। কনসালটেন্ট নিয়োগ ছাড়া গণপূর্ত বিভাগ দিয়ে এই ইউনিট স্থাপন বা মেরামত সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড অন্য কোথাও উৎপাদন হয় না

। তবে বেসরকারি পর্যায়ের ৩-৪টি প্রতিষ্ঠান এটি উৎপাদন করতে প্রস্তুত আছে। তবে উৎপাদন মূল্য আইপিএইচ’র চেয়ে বেশি পড়বে। তিনি আইপিএইচকে ফার্মাসিউটিক্যাল রোল থেকে বের করে এনে ট্রেনিং সেন্টারে রূপান্তর করার পরামর্শ দেন। সভায় একই সুরে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

Please follow and like us: