আল্লাহ্‌র কাছে ৪ টি মাস পবিত্র ও সম্মানিত

August 14, 2020 8:37 pm

নিউজ ডেক্সঃ

সৃষ্টির সূচনা থেকেই মাসের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে আল্লাহ্‌র কাছে ৪ টি মাস পবিত্র ও সম্মানিত। এ ব্যাপারে আল্লাহ্‌ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই মাস সমূহের সংখ্যা আল্লাহ্‌র কাছে ১২। আর তা সুনির্দিষ্ট রয়েছে আল্লাহ্‌র কিতাবে সেদিন থেকে, যেদিন তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। সুতরাং এই মাসগুলোর ব্যপারে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করোনা।” [ সূরা তওবাঃ ৩৬][ আর এই ৪ টি মাসের মধ্যে মহরম বছরের প্রথম মাস। আর এই মাস নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।”

আরবী আশারা শব্দ থেকে “আশুরা” শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ দশম। মহরম মাসের দশ তারিখকে তাই আশুরা বলা হয়। ইতিহাসের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই ১০ই মহরম। তার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলোঃ
এই দিনেই হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহ্‌ তার প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেন। এই দিনেই হযরত আদম (আঃ) এর অপরাধ ক্ষমা করা হয়।

এই পবিত্র দিনেই হযরত নূহ (আঃ) এর নৌকা মহাপ্লাবন শেষে জুদী পাহাড়ের পাদদেশে এসে থেমেছিল।
এই দিনেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) নমরুদের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি পান।

এই দিনেই হযরত আইয়ুব (আঃ) রোগমুক্ত হন।
এই দিনেই হযরত সোলাইমান (আঃ) তার হারানো রাজত্ব ফিরে পান। এই দিনেই হযরত ইউনুস (আঃ) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান।

এই দিনেই হযরত ইয়াকুব (আঃ) তার হারানো পুত্র ইউসুফ (আঃ) কে চল্লিশ বছর পর ফিরে পান।
এই দিনেই মুসা (আঃ) তার অনুসারীদের নিয়ে নীল নদ অতিক্রম করেন আর পক্ষান্তরে ফেরাউন তার দলবল সহ নীলনদে ডুবে মৃত্যু বরণ করে। এই দিন হল প্রায় দুই হাজার নবী-রাসুলের শুভ জন্মদিন।

এই দিনে এত বরকতময় ঘটনা ঘটার কারণ হল এই দিন মহান রাব্বুল আলামীন এর অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন। অর্থাৎ সৃষ্টি জগত সৃষ্টি করে এই পবিত্র দিনেই আল্লাহ্‌ তায়ালা রাব্বুল আলামীন আরশে সমাসীন হয়ে তার সৃষ্টির সামনে নিজেকে প্রভু হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্‌ ফরমান, “আমি ছিলাম গুপ্ত ধনাগার, নিজেকে প্রকাশ করতে ভালবাসলাম, তাই সৃষ্টিজগত সৃজন করলাম।”

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্‌ এরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্‌, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন ছয় দিনে। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন এবং প্রতিটি বিষয় পরিচালনা (করতে শুরু) করেন।” [সূরা ইউনুসঃ ৩]

সেদিন আরশে সমাসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে যে অভিষেক অনুষ্ঠান হয়েছিলো সেই অনুষ্ঠানে সকল আদম সন্তানের রুহু সমূহ মহান আল্লাহ্‌র সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্‌কে প্রভু হিসেবে স্বীকার করে নেয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্‌ এরশাদ করেন, “হে রাসুল! আপনি স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে আনলেন এবং তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিলেন তাদেরই সম্বন্ধে এবং বললেন, “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী রইলাম।“ [সূরা আরাফঃ ১৭২]
উল্লেখ্য যে মহান রাব্বুল আলামীনের আরশে সমাসীন হওয়ার এই দিনটি ছিল ১০ই মহরম, শুক্রবার।

বর্ণীত হাদিসটি তফসীরে দূররে মানসুরের ৮ম খণ্ডে হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তায়ালা আসমান জমিন এই দুইয়ের মাঝে যা কিছু আছে তা সৃষ্টির সূচনা করেছেন রবিবার দিন। অতঃপর তিনি (সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করে) শুক্রবার দিন (আশুরার দিন) আরশে সমাসীন হয়েছেন।”
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ্‌ তায়ালা হযরত আদম (আঃ) কে শুক্রবার আছরের পর সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন।” [মেশকাত শরীফ ও মুসলিম শরীফ] মূলত এই দিনটি ছিল মহরম মাসের ১০ তারিখ, শুক্রবার।

গুনিয়াতুত তালিবীন কিতাবে কাদেরীয়া তরিকার ইমাম হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলহানী (রহঃ) লিখেছেন, “আল্লাহ্‌ তায়ালা রাব্বুল আলামীন আশুরার দিন আরশে সমাসীন হয়েছেন। আর এই বিশ্বজাহান ধ্বংসও হবে এ দিনে। সর্বপ্রথম বৃষ্টি ও আল্লাহ্‌র রহমত দুনিয়াতে বর্ষিত হয় এ আশুরার দিনেই।”

পবিত্র আশুরা বা ১০ই মহরম মহান রাব্বুল আলামীনের অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন হওয়ার কারণেই এই দিনের সম্মান ও মহাত্মকে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যেমনঃ কোন রাজ্যের রাজার অভিষেক অনুষ্ঠানের দিনটি সেই রাজ্যের রাজা ও প্রজাদের কাছে বিশেষ স্মরণীয় দিন। সেই দিনটি ঐ রাজ্যের প্রজাদের চাওয়া-পাওয়ার দিন। তেমনি ভাবে আশুরা হল বান্দাদের জন্য মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা রাব্বুল আলামীনের নিকট চাওয়া-পাওয়ার দিন। এজন্যই মহান রাব্বুল আলামীন তার অভিষেকের দিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই তার এই সৃষ্টিজগতে অসংখ্য ঘটনার অবতারণা করেছেন।

পবিত্র আশুরার ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না থাকার জন্যই মুসলিম জাতি এ দিনটিকে সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করতে পারছেনা। কারবালায় ইমাম হোসেন (রাঃ) তার ৭২ জন সঙ্গী-সাথী নিয়ে যে শাহাদাৎ বরণ করেছিলেন তা এই পবিত্র আশুরার দিনেই। আমাদের অনেকের ধারণা যে কারবালায় ইমাম হোসেন (রাঃ) এর বিয়োগান্তক ঘটনার কারণেই এই দিনটি মুসলিম বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছে। আবার শিয়া সম্প্রদায় যেহেতু এই দিনটি শোকের সাথে পালন করে তাই অজ্ঞতার কারণে অনেকে ধারণা করে থাকেন যে এই আশুরা আসলে শিয়াদের অনুষ্ঠান।

১০ই মহরম বা আশুরা-সৃষ্টির সূচনা থেকে উদযাপিত হওয়া এক ঐতিহাসিক দিন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) পবিত্র মদিনায় আগমন করে দেখলেন যে ইহুদী সম্প্রদায় আশুরার দিন রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা এই দিনে কেন রোজা পালন করো?” তারা বলল, এটি এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ্‌ মুসা (আঃ) কে রক্ষা করেছিলেন আর ফেরাউনের দলকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন।” সেজন্য মুসা (আঃ) আল্লাহ্‌র কাছে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই দিনে রোজা রাখেছেন। আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) শুনে বললেন, মুসা (আঃ) এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে তোমাদের থেকে আমরাই বেশী অগ্রগামী। সুতরাং, তিনি আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদেরও রোজা পালনের নির্দেশ দেন।” [ বোখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, বায়হাকী শরীফ, তফসীরে দূররে মানসুর-৩০তম খণ্ড ]
বর্ণীত হাদিসটি তফসীরের কিতাব তফসীরে দূররে মানসুরের ৩০ নং খণ্ডে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুল (সাঃ) এরশাদ করে, “আশুরার দিনটি এমন একটি দিন যে, সমস্ত নবী-রাসুলগণ এই দিনে রোজা রাখতেন। সুতরাং, তোমরাও এই দিনে রোজা রাখো।”

বর্ণীত হাদিসটি হাদিসের কিতাব বোখারী শরীফের ২য় খণ্ডে হযরত আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণীত হয়েছে। তিনি বলেন, “পবিত্র রমজানের পূর্বে আশুরার রোজা রাখা হত। যখন রমজানের রোজা ফরজ হল, আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখতে চায় সে রাখতে পারে আর যে ঐদিন রোজা না রাখে তাতেও কোন অসুবিধা নেই।”

বর্ণীত হাদিসটি তফসীরের কিতাব তফসীরে দূররে মানসুরের ৩০ নং খণ্ডে হযরত জাবের (রাঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি আশুরার দিন নিজ পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবে সে, আল্লাহ্‌ তায়ালা তার জন্য সারা বছর পর্যাপ্ত রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।”
আমরা এই মানব জাতি, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে দয়াময় রাব্বুল আলামীনের প্রভু হিসেবে আত্মপ্রকাশের এই পবিত্র আশুরার দিনটি যদি যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করতে সক্ষম হই তাহলে তা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে অবারিত রহমত ও বরকত লাভের উছিলা হিসেবে কাজ করবে।

Please follow and like us: