বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কুষ্টিয়া জেলার অবদান

November 28, 2020 6:23 pm

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

কুষ্টিয়া হলো বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা যা পূর্বে নদীয়া জেলা নামে পরিচিত ছিল। এটি মনে করা হয় কুষ্টিয়া শব্দটি কুষ্ঠ নামক শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ পাট। কুষ্টিয়া জেলার উত্তরে রাজশাহী, নাটোর এবং পাবনা, পূর্বে পাবনা এবং রাজবাড়ী জেলা দক্ষিনে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং পশ্চিমে ভারতে অবস্থিত। এর আয়তন ১৬২১.১৫ বর্গ কিলোমিটার। কুষ্টিয়া মুঘল আমলের সংস্কৃতির ধারক যার উদাহরণ স্বরূপ শাহী মসজিদের কথা বলা যেতে পারে। সম্রাট শাহজাহানের আমলে এখানে নদী দুর্গ গড়ে তোলা হয়েছিল। গড়াই কালী গাঙ্গ এবং গঙ্গা নামক নদীমাতৃক জেলা এই কুষ্টিয়া জেলা।

কুষ্টিয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের সংস্কৃতির নগরী। রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সম্রাট লালন শাহ এর মাজার, মীর মোশারফ হোসেনের পিতৃভূমি, কাঙ্গাল হরিনাথ এর জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলা। কুষ্টিয়ার শিলাইদহে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাটিয়েছেন তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়। ১৮৯১-১৯০১ এই সময়টিতে নোবেল বিজয়ী কবি তাদের পারিবারিক সম্পত্তি যা জামিন্দরি নামে পরিচিত তার দেখাশোনার কাজে মাঝে মাঝে আসতেন শিলাইদহের কুঠিবাড়ি। কুঠিবাড়ির শান্ত পরিবেশ কবিকে উৎসাহিত করেছিল অবিস্মরনীয় অনেক পদ্ম রচনা করতে বাংলা সাহিত্যকেসাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, নাট্যকার ডি এল রায় কথা সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, লালন শাহ, কাঙাল হরিনাথসহ আরো অনেকে এখানে আসতেন কবির সাথে আড্ডা দিতে। কুঠিবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীতে বসে কবি রচনা করেছেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কথা ও কাহিনী যেগুলো ছিল অধিকাংশই খেয়া ও নৈবদ্য কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এখানেই কবি লিখেছেন ছিন্নপত্রাবলীসহ অনেক গান যার অধিকাংশের অস্তিত্ব মিলে গীতাঞ্জলি গীতিমাল্যতে।

বাউল সম্রাট, লেখক, সাধক আধ্যাত্মিক গানের রচয়িতা, সমাজ সংস্কারক এবং বাংলা সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র লালন শাহের পরিচয় মিলে কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামে। তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন প্রথাগত ও গত্রিয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে যার পরিচয় মিলে তার রচিত গান ও সুরে। তার রচিত গানের কথায় উৎসাহিত ও প্রভাবিত হয়েছেন অনেক বিখ্যাত কবি এবং সামাজিক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদ যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অ্যালেন গিন্সবার্গ। বাংলা সংস্কৃতিতে তার অনবদ্য অবদানের পরিচায়ক তার রচিত ধন্য ধন্য বলি তারে, জাত গেল জাত গেল বলে, তিন পাগলে হলো মেলা, বাড়ির কাছে আরশিনগর, আমি অপার হয়ে বসে আছি, খাচার ভেতর অচিন পাখি, সময় গেলে সাধন হবে না, কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা ইত্যাদি অসংখ্য লালনগীতির মাধ্যমে।

উপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মুসলিম লেখক সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত কুমারখালী উপজেলার লাহিড়ীপাড়া গ্রামে। যিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মহাকাব্য বিষাদসিন্ধু রচনার মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস ও চেতনায় হাসান-হোসেন ও কারবালার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সুনিপুণ শৈলীতে। তার অনবদ্য ভূমিকা পরিলক্ষিত হয় তার সৃষ্ট জমিদার দর্পণ, রত্নাবতী, বসন্তকুমারী ,বেহুলা, গীতাভিনয়, গড়াই ব্রিজ, গোজীবন, মুসলমানের বাংলা শিক্ষা ১,২, গাজী মিয়ার বস্তানী সহ আরো কিছু সাহিত্য কর্মে।

হরিনাথ মজুমদার যিনি ছিলেন কাঙাল হরিনাথ নামে পরিচিত একজন সাংবাদিক। যিনি কলম ধরেছিলেন দরিদ্র ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষে এই মহান ব্যক্তিটির জন্ম এই কুষ্টিয়া জেলায়। তিনি লিখেছেন সংবাদ প্রভাকর ও গ্রামবার্তা প্রকাশিকায়। তিনি লালন আদর্শে জীবনকে পরিচালিত করেছেন এবং লিখেছেন বিজয় বসন্ত, চারু- চরিত্র, কবিতা কুমোদি, অংকুর সংবাদ, ফকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলীসহ আর্টটি বই যা বাংলা সাহিত্যে উনমোচন করেছে সম্ভাবনার নতুন দ্বার।

কুষ্টিয়ার ভাষা অনেক পরিচ্ছন্ন, সাবলীল ও সুস্পষ্ট হওয়ায় এই ভাষাতেই বাংলাদেশের অধিকাংশ বই লিখা হয়। সংস্কৃতির এই নগরীতে রয়েছে পাবলিক লাইব্রেরী, নারী সংগঠন, ক্লাব, সঙ্গীত কলেজ, যাত্রাদল, থিয়েটার গ্রুপ, থিয়েটার স্টেজ, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমী, সাহিত্য সমাজ, সিনেমা হল ইত্যাদি একটি দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি বাহক।

লেখকঃ

রোজিনা আক্তার,
প্রভাষক, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ,
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ, সাভার, ঢাকা।