কর্মক্ষেত্রে বিষাক্ত পরিবেশ এবং এর কারণসমূহ

November 30, 2020 1:44 pm

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

যে কর্মপরিবেশ আমাদের ভালো লাগে না, যেখানে আমরা সব সময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকি একাকীত্ব ভুগি শুধুই মনে হয় কখন কাজ শেষ হবে আর কখন আমরা বাড়িতে যাব। এই রকম মানসিক চাপ বেষ্টিত এবং অসহযোগী মনোভাব সম্পন্ন পরিবেশে কাজ করা খুব একটা সহজ কাজ নয়।

কর্ম পরিবেশ যদি এমন হয় যেখানে চাপে পড়ে রুটিরুজির জন্য কাজ করতে হয় কর্ম পরিবেশের জন্য কোন প্রকার ভালোবাসা থাকেনা মমতা থাকেনা তখন আমাদের বুঝতে হবে আমরা যেখানে আছি সেখানকার কার্যপরিবেশ বা কাজ করার পরিবেশ বিষাক্ত।

মূলত ৬টিকারণে কর্মপরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে| কারণ গুলো হলোঃ

১.উচ্চ টার্ন ওভার: উচ্চ টার্নওভার বলতে আমরা বুঝি খুব তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতাকে| মূলত দুর্বল নিয়োগ বিধি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে উত্থান ঘটে থাকে, আরো সুনির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে কর্মক্ষেত্রে অত্যধিকচাপ, কর্মক্ষেত্রের সূচক নির্ধারণ, দুর্বল নেতৃত্ব সহকর্মীদের অসহযোগী মনোভাব, কাজের বিষয় বস্তু, কাজের অসন্তুষ্টি এবং দুর্বল ও অপর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে প্রতিষ্ঠান থেকে খুব দ্রুত কর্মীরা সরে যায়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য খুব দ্রুত তাদের শূন্যস্থানে কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। উচ্চ টার্ন ওভার হতে পারে নেতৃত্বের অবস্থান থেকে, হতে পারে নির্দিষ্ট একটা বিভাগের কর্মীদের মধ্য থেকে অথবা আমাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে যে জায়গায় অবস্থানে আমরা কাজ করে থাকি সেখান থেকে।

২। কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক চক্র: যে কোন প্রতিষ্ঠানে সেটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হোক অথবা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সব সময় একটা নেতিবাচক চক্র কাজ করে। তারা সব সময় অন্যের দোষ, ভুল-ভ্রান্তি ধরতে সদা ব্যস্ত থাকে। তারা অন্যের সততা, কাজের প্রতি আন্তরিকতা, কঠিন শ্রম এগুলোর মত ইতিবাচক দিকগুলো কখনো খেয়াল করে না বা খেয়াল করলেও প্রকাশ করতে চায় না। তারা সব সময় কর্মীদের নেতিবাচক দিকগুলো উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বাব্যবস্থাপক ক্ষেত্র বিশেষে মালিকের নিকট ছড়ায়। এতে করে সৎ আন্তরিক অদক্ষ মানুষের জন্য কর্ম পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

৩। সব সময় কাজের ফলাফল এর দিকে দৃষ্টি পাত: একটা কাজ প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী যে আন্তরিকতার সাথে, সততার সাথে কাজ করুক না কেন এই বিষয়টি বেশির ভাগ সময় ব্যবস্থাপক বা মালিকের দৃষ্টি গোচর হয় না যদি আশানুরূপ পণ্য বিক্রি না হয় অথবা লাভ না হয়। বিশেষ করে যারা বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কাজ করেন তারা যে কত আন্তরিকতার সাথে, কত বিনয়ের সাথে এবং সদ্ব্য বহার এর মাধ্যমে ক্রেতা এবং ভোক্তা যারা আছেন তাদেরকে পণ্য সম্বন্ধে বুঝিয়ে বলেন, কিন্তু কাঙ্খিত মুনাফা অর্জন না করতে পারলে তাদের আন্তরিকতার কোন দাম থাকে না। মালিক বাব্যবস্থাপক যারা আছেন তারা কর্মীদের আন্তরিকতা, চেষ্টা এগুলোকে মূল্যায়ন করেন না।এক্ষেত্রে মালিকপক্ষ বাব্যবস্থাপক যারা থাকেন তারা বিক্রয় কর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে থাকেন এবং চাকরি হারানোর ভয় দেখান।

৪। ব্যবস্থাপকের পছন্দ সই কর্মী বা কর্মী বাহিনী: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকের কিছু পছন্দ সই কর্মী বা কর্মী বাহিনী থাকেন। যাদের প্রতি ব্যবস্থাপক সর্বদা দুর্বল থাকেন। এই পছন্দ সই কর্মী বাহিনী থাকার কারণে অন্যান্য কর্মীদের সততা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম কোন কিছু ব্যবস্থাপকের দৃষ্টি গোচর হয়না।সমস্ত সুযোগ সুবিধা এই পছন্দ সই কর্মী বাহিনী পেয়ে থাকেন যেটা বৈধ হতে পারে আবার অবৈধ হতে পারে। ব্যবস্থাপকের ব্যক্তিগত পছন্দ তাদের এই অর্জনের অন্যতম কারণ। এতে করে সৎ, নিষ্ঠাবান, আন্তরিক কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার এটিও একটি বড় কারণ।

৫। যোগাযোগের সমস্যা: কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ সমস্যা অনেক ধরনের হতে পারে অনেক সময় ব্যবস্থাপক অথবা সুপার ভাইজার সাপ্তাহিক বা মাসিক সভা আহবানের মাধ্যমে কর্মীদের প্রতিষ্ঠান বর্তমান অবস্থা, লাভ ক্ষতি, প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে কোনো তথ্য হালনাগাদ করেন না। ক্রেতার সাথে সম্পর্ক কেমন, কোন প্রক্রিয়ায় সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায় এবিষয়ে কোনো পরামর্শ দেন না। ক্রেতাদের কোন জিনিসের চাহিদা কেমন, চাহিদা অনুযায়ী ক্রেতা কত দাম দিতে চান এই বিষয়ে জানার এবং অধিনস্তদের জানানোর আগ্রহ থাকেনা। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান ভেতরে সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগের অভাবে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনা। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বিষাক্ত হওয়ার জন্য এটিও একটি উল্লেখ যোগ্য কারণ।

৬। কর্মক্ষেত্রের কর্মপন্থা অনুসরণ অসঙ্গতি: একটি প্রতিষ্ঠান ছোট হোক অথবা বৃহদায়তন যাই হোক না কেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট একটা পরিকল্পনা থাকা উচিত। কর্মপন্থা কর্মীদের কি করা উচিত, কি করা থেকে বিরত থাকা উচিত এবিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ না থাকে। প্রতিষ্ঠানের মালিক বা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে যারা থাকেন তারা চান কর্মীরা যেন কর্মপন্থা অনুযায়ী বুঝে শুনে কাজ করেন। সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান এবং কর্মীদের সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা এবং কর্মপন্থা পরিবর্তন যোগ্য হতে হবে। পরিকল্পনা এবং কর্মপন্থা যদি পরিবর্তনের সুযোগ না থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনার কর্মক্ষেত্র আপনার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। এরকম কর্মপরিবেশে আপনার মেধার বিকাশ সম্ভব নয় এবং আপনার দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ খুব একটা থাকে না।

দুর্ভাগ্যক্রমে কর্মক্ষেত্র এর কম অনেক অবস্থা বা পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে যেখানে আমরা অন্যজন কী করলো, কি করলো না এবিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। বিষাক্ত পরিবেশে কাজ করাটা নির্ভর করে আমাদের সহ্য শক্তির উপর। যদি বিষাক্ত কর্মপরিবেশ আমাদের কর্মক্ষেত্রে কাজে অনীহা তৈরি করে, কর্মস্পৃহা নষ্ট করে দেয়, কর্মক্ষেত্রের ভেতরে এবং বাইরে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়, শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তাহলে এধরনের কর্মপরিবেশ থেকে আমাদের দ্রুত বের হয়ে আসার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময় এখনই।

লেখকঃ

মার্জিনা আক্তার রেবা
প্রভাষক, ব্যবসা প্রশাসন বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ