হারিয়ে যাচ্ছে কাহার সম্প্রদায়, দেখা মিলে না পালকীর

January 2, 2021 10:20 pm

নিউজ ডেক্সঃ

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় উত্তরবঙ্গে কাহার সম্প্রদায়ের সন্ধান মেলে। তবে সংখ্যায় তা নগণ্য। ক্ষেত্রানুসন্ধানে জানা যায়, জীবন-জীবিকার তাগিদে স্বপেশা ত্যাগ করে স্বচ্ছল জীবনযাপনের লক্ষে এ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিভিন্ন পেশা (রিকশা, দিনমজুর, গার্মেন্টসকর্মী, ইটভাটার শ্রমিক) গ্রহণ করেছে। সাক্ষাৎকারে কাহার সম্প্রদায়ের ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন – উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাসপ্রথা বিলোপের পর বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এবং মধ্যদেশ থেকে পালকি বাহকরা শুষ্ক মৌসুমে বাংলায় আসতে থাকে। বাংলায় আসার পর এরা বর-কনে, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ কিংবা অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসালয়ে বহনের কাজ করতো। এক পর্যায়ে তারা এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কাহার সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বহু সাঁওতালও পালকি বাহকের কাজ করতেন।

পেশাগত দিক থেকে বেহারা ও কাহার শব্দটি দুটি একে অপরের পরিপূরক। বেহারা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- পালকি-বাহক, কাহার। অনেকের মতে, ইংরেজি বিয়ারার শব্দ থেকে বেহারা নামের উদ্ভব হয়েছে। অন্যদিকে কাহার আরবী শব্দ। ফারসী ভাষায়ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ জবরদস্তকারী, জুলুমবাজ। হিন্দু ধর্মের একটি তত্ত¡মতে, কাহারদের উৎপত্তি হয়েছে নিম্নবর্ণের এক হিন্দু সম্প্রদায় থেকে এবং এ শ্রেণি ব্রাহ্মণ পিতা ও চণ্ডাল মাতার বংশোদ্ভূত এক মিশ্রবর্ণের প্রতিনিধিত্বকারী। কাহারগণ অবশ্য নিজেদের মগধের রাজা জরাসন্দের বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে। একই সামাজিক মর্যাদার অন্যান্য বর্ণের অনুসৃত ধর্মের মতোই কাহারদের ধর্ম। তাদের অধিকাংশই শিব বা শক্তির পূজারী এবং তাদের মধ্যে বৈষ্ণবদের সংখ্যা ন্যূন। সামাজিক বিচারে কাহারগণ কুর্মি ও গোয়ালা বর্ণের সমকক্ষ। এ প্রসঙ্গে জাহিদুর রহমান বলেন- কাহার নিচুজাতের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। কথিত আছে কাহারদের আদি পুরুষ ছিল বাংলার শেষ পাঠান বাদশাহর সৈনিক। মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আতœগোপন করে এবং বাংলার নিম্নবর্ণের হিন্দু চাড়াল বেহারা জাতীয় ডুলি-পাল্কী বাহকদের নিকট আশ্রয় ও সাহায্য পায়। এরা পরস্পর বিয়ে-শাদীতে আবদ্ধ হয়। পরবর্তীকালে তারাও ডুলী-পাল্কী বহন করার পেশা গ্রহণ করে। [দ্র. বাংলাদেশের পেশাজীবী, ঢাকা, ২০০৭] অতএব বলা যায়, কাহাররাই বেহারার সম্প্রদায়ভুক্ত। এরা মূলত পালকি বহনের কাজ করতো। নীহাররঞ্জন রায় প্রণীত বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব গ্রন্থে কাহারদের পালকি বহনের বর্ণনা পাওয়া যায়। অতীতে কনের বাড়ি থেকে বরের বাড়ি অথবা বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ি যাতায়াতের জন্য বেহারাদের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। এছাড়াও জমিদার, তালুকদার, ভূস্বামী, রাজা-বাদশা ও উচ্চবিত্তদের নিজস্ব পালকি ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। আঠারো শতকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পালকির প্রচলন শুরু হয়। ক্রমেই তা বাঙালি সমাজে যানবাহনের অন্যতম মাধ্যমে রূপ নেয়।

এ সম্প্রদায়ের লোকদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি- যা বাংলার সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। এর মধ্যে পালকি নৃত্য অন্যতম। নব দম্পতিকে পালকিতে বহন করার সময় পথে পথে বেহারা এক হাতে পালকির বর্ধিত কাষ্ঠখণ্ড ধরে অন্য হাতে সবাই এক সাথে তালে তালে গা দুলিয়ে এই নৃত্য পরিবেশন করতো। এই নৃত্য ছিল শাস্ত্রীয় বর্হিভূত নৃত্য। কিন্তু পরিবেশনা ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর। নৃত্যের তালে তালে সঙ্গীত পরিবেশনাও এই সম্প্রদায়ের অন্যতম আকর্ষণ। পালকির প্রসঙ্গটি উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া গানে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন-

ও মুই পালকি না চড়োং ধুল্যা নাগিবে
সোয়ারিতে না বসোং গাও এড়াইবে।

লোকসঙ্গীতে যেমন বেহারাদের প্রসঙ্গ এসেছে তেমনি বাংলা লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সাহিত্য লোকছড়াতেও পালকির বিষয়টি পরিস্ফুট। যেমন-
গরিব মানুষ ফড়িং খায়
পাল্কী চড়ে বাহ্যে যায় \

অথবা

পাল্কীর মধ্যে পাকা ধান
বর আসছে মুসলমান
বরের মাথায় কাঠ কুঠা
বৌয়ের মাথায় ঝাপা
দেখে যা সাধের বর
চাপদাড়ি তার পাকা

প্রবাদে পালকির বিষয়টি এসেছে এভাবে – ঘ্যাগীক শেন পোষে না, ঘ্যাগী পালকি ছাড়া নড়ে না।

পরিশেষে বলা যায়, বহু পথ-পরিক্রমায় বেহারা বা কাহার সম্প্রদায় আজও কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে চির ভাস্বর। একদিকে অবহেলা অন্যদিকে জীবন-জীবিকার নিরন্তর সংগ্রামে অন্য পেশা যেমন কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও ছোটোখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি গ্রহণ করলেও টিকিয়ে রেখেছে নিজস্ব সংস্কৃতিকে। যা প্রয়োজনের গণ্ডিমুক্ত হয়ে মানুষের সৃষ্টিশীলতার আলোয় প্রোজ্জ্বল।

ড. মো. এরশাদুল হক
অধ্যাপক ও ফোকলোর গবেষক।