সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ

January 27, 2021 10:45 am

নিউজ ডেক্সঃ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ভোটের মধ্য দিয়ে ১৯ লাখ ভোটার আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচন করবেন চট্টগ্রামের নতুন ‘নগরপিতা’। দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো এই সিটি করপোরেশন নির্বাচন শীতের সকালে অন্যরকম উত্তাপ নিয়ে হাজির হয়েছে চট্টগ্রামে।

বুধবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল ৮টায় চট্টগ্রাম নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে ৭৩৫ ভোটকেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। শেষ হবে বিকেল ৪টায়। গণনা শেষে নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়ামে নির্বাচন কমিশনের স্থাপিত অস্থায়ী কেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণা করবেন রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান।

গত বছরের ২৯ মার্চ চসিকের এই নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সেই নির্বাচন ১০ মাস পিছিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। প্রথমবারের মতো পুরোপুরি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করে ভোট নেওয়া হচ্ছে এই নির্বাচনে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছি। চট্টগ্রাম নগরীকে নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করা হয়েছে, যেন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার সুযোগ না থাকে। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন, নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন— সেটি আমরা নিশ্চিত করেছি। আশা করছি উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচনে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা কেউ ঘটাতে চাইলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নিয়ম মেনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হবে। কেউ শান্তিভঙ্গ করতে চাইলে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।’

চসিকের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিন নগরীর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে কদম মোবারক ইএমওয়াই উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রথম ভোট দিয়েছেন। এসময় তিনি বলেন,‘ ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিয়েছি। এখানে যা দেখলাম, জাল ভোট দেওয়ার বা জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই। যার ভোট সেই একমাত্র দিতে পারবে। নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য হবে। আমাদের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী অবশ্যই বিজয়ী হবেন।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত জন— আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আবুল মনজুর, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মতিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হাতি প্রতীকে খোকন চৌধুরী, চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জান্নাতুল ইসলাম, নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের রেজাউল করিম চৌধুরী ও ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রেজাউল ও বিএনপির শাহাদাতের মধ্যে মূল লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে প্রচারণা হয়। জোর প্রচারণা চালিয়েছেন রেজাউল ও শাহাদাত।

নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে মেয়র এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ভোটগ্রহণ হলেও সাধারণ কাউন্সিলর পদে দু’টি ওয়ার্ডে নির্বাচন হচ্ছে না। এর মধ্যে ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত হারুনুর রশীদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছেন। ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী তারেক সোলায়মান সেলিম সম্প্রতি মারা গেছেন। এর ফলে ওই ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।

সাধারণ ও সংরক্ষিত মিলিয়ে ভোটের মাঠে লড়ছেন ২২৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী। এর মধ্যে ৩৯ ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বদ্বিতায় আছেন ১৬৯ জন। বাকি দুই ওয়ার্ডে ওই পদে নির্বাচন হচ্ছে না। সংরক্ষিত ১৪টি ওয়ার্ডে নারী কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন ৫৭ জন।

প্রায় প্রত্যেক ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থনের বাইরে একাধিক প্রার্থী আছেন। এসব ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’দের কারণে নির্বাচনে সংঘাত সৃষ্টির আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে শুরু থেকেই।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ভোটারের সংখ্যা ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৯২ হাজার ৩৩ জন। মহিলা ভোটার ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭৩ জন।

নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৭৩৫টি। সংঘাতের আশঙ্কায় পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন ৪১৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ভোটকক্ষ আছে ৪ হাজার ৮৮৬টি। অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র আছে দুইটি। অস্থায়ী ভোটকক্ষ আছে ৭৬৪টি। ভোটগ্রহণের দায়িত্বে আছেন ৭৩৫ জন প্রিজাইডিং, ১৪৭০ জন সহকারী প্রিজাইডিং ও ২৯৪০ জন পোলিং অফিসার।

নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রসহ সার্বিক নিরাপত্তায় মোতায়েন পুলিশ-র‌্যাব-আনসার-বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১৮ হাজার সদস্য।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, নির্বাচনে পুলিশের ৭ হাজার ৭৭২ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ২৫ প্লাটুন বিজিবি ও র‌্যাবের ৪১টি দল আছে। এছাড়া মোবাইল টিম আছে ৪১০টি। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে আছে ১৪০টি দল। প্রতিটি ওয়ার্ডে আছে র‌্যাব ও পুলিশের একটি করে টিম। আনসারের প্রায় তিন হাজার আটশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ৬৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন, এর মধ্যে ৪১ ওয়ার্ডে আছেন ৪১ জন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছেন ২০ জন।

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ৮ জন পুলিশ ও ১০ জন আনসার সদস্য মিলিয়ে ১৮ জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সাধারণ কেন্দ্রগুলোতে আছেন ছয় জন পুলিশ ও ১০ জন আনসার সদস্য।

এবার প্রথমবারের মতো সাধারণ ছুটি ঘোষণা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ছাড়া ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার একটি সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে সিএমপি।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ২৪ ঘণ্টা চট্টগ্রাম নগরীতে জরুরি সেবার বাইরে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে।

মা-বাবার কবর জিয়ারত শেষে ‍বুধবার সকাল ৯টায় নগরীর বহদ্দারহাটে এখলাসুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর। আর বিএনপির শাহাদাতের ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে বাকলিয়ায় বিএড কলেজ কেন্দ্রে।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দীন বিএনপি সমর্থিত কমলালেবু প্রতীকের প্রার্থী এম মনজুর আলমকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন জাতীয় পার্টির মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বিএনপির মীর মো. নাছির উদ্দিন, আওয়ামী লীগের এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বিএনপির এম মনজুর আলম ও আওয়ামী লীগের আ জ ম নাছির উদ্দীন। এর মধ্যে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। পরপর তিন দফা নির্বাচিত হয়ে তিনি ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন চসিকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।