গাজীপুরে দুর্ভোগ মেনে নিয়ে চলাচল করছে দুর্পাল্লার গণপরিবহণ, যাত্রী ও পথচারীরা

June 20, 2021 1:45 pm

স্টাফ রিপোর্টারঃ

ঢাকার অদুরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-ময়মনসিহ মহাসড়ক। এই সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম একটি মহাসড়ক।

তবে গেল কয়েক বছর ধরেই সড়ক ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে। বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় চরম ভোগান্তি সহ্য করে এই সড়কে চলাচল করছে দুরপাল্লার পরিবহনসহ সব ধরণের যানবাহন। দিনকে দিন বাড়ছে যাত্রীদের দুর্ভোগও।

টঙ্গী থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার পুরো সড়কে চলছে নির্মাণ কাজ। ফ্লাইওভার, ওভারপাস, বাস রেপিড ট্রানজিট (বিআরটি), সাধারণ যান চলাচলের পৃথক লেন নির্মাণ ও পয়নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনের নির্মাণ কাজ। এসব নির্মাণ কাজ একসঙ্গে চলছে তবে একটিও এখনও সম্পন্ন বা শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এদিকে নির্মাণ কাজের জন্য ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে ১৩ কিলোমিটার পিচঢালা পথের সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় হাজারও খানাখন্দ ও গর্ত।

বর্ষার মৌসুমে সামান্য বৃষ্টির পানিতে সড়কটি তলিয়ে যায়। পুরো সড়কটি থাকে কর্দমাক্ত। বেশিরভাগ স্থানে জমে থাকে পানি। শুধু তাই নয়, বছরের অন্যান্য ঋতুতে সড়কটি ধুলো-বালিতে অন্ধকারাচ্ছান্ন থাকে। সব মিলিয়ে বছরজুড়েই এই সড়কে জনদুর্ভোগের অন্ত নেই। যোগাযোগের বিকল্প সড়ক না থাকায় দুর্ভোগ মেনে নিয়ে চলাচল করছে দুর্পাল্লার গণপরিবহণ, যাত্রী ও পথচারীরা। গাজীপুরবাসির প্রশ্ন একটি-ই এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়?

স্থানীয়রা বলছে, সড়কে একসঙ্গে সব নির্মাণ কাজ শুরু করার কারণে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। এতে পুরো সড়কটি কেটে-ছেটে, ভেঙে নতুন প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া বছরের পর বছর দুর্ভোগ বাড়ছে ঠিকই কিন্তু কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। সড়কে নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে আমরা গাজীপুরবাসী পড়েছি চরম দুর্ভোগে।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বরত পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একাধিক সদস্য জানান, রাস্তার নির্মাণ কাজের কারণে আমরাও অনেক বিপদে রয়েছি। বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ ও গর্তে পড়ে যাববাহন আটকে যায়। এতে যখন যানজটের সৃষ্টি হয়, তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। এদিকে, সড়কে নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় সব ধরনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে। মহাসড়কে রিকশা অটোরিকশা ও ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচলের কোনো নিয়ম নেই, কিন্তু এগুলো হরধুম চলছে।

কাপাশিয়া টোক টু গুলিস্তান রুটে চলাচলকারী বনশ্রী পরিবহনের চালক মো. মোজাম্মেল বলেন, আমাদের গাড়ির রুট পারমিন্ট এই সড়কেই। এছাড়া অন্য কোনো বিকল্প সড়ক নেই। বাধ্য হয়ে এই সড়কটি ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সড়কের বড় বড় গর্ত, গাড়ির চাক্কা (চাকা) পড়লে পুলিশের রেকার দিয়া টাইনা উঠাইতে হয়। আর এর জন্য রেকার বিলও দিতে হয়। সরদিক দিয়া আমাগোই লস (লোকসান)।

এদিকে, গাজীপুরের বাসিন্দা ও নাগরিক হিসেবে এই সড়কে জনদুর্ভোগের দ্রুত সমাধান চাইলেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের বাসিন্দা ও নাগরিক হিসেবে আমরা চাই টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত সড়কটি ক্লিয়ার করে দেওয়া হোক। মানুষ যাতে চলাচল করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সামনে ঈদ-উল আযহা আসছে। সবার সহযোগতিার মধ্য দিয়ে সড়কের এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে চাই। প্রযোজনে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এই ঠিকাদারের সঙ্গে থেকে আমরা সহযোগিতা করতে চাই।

মেয়র জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘গাজীপুর অংশে বিআরটি প্রজেক্টের যে ঠিকাদার রয়েছে, তাদের সময়জ্ঞান নেই। আমি মনে করি, তাদের মধ্যে বড় ধরনের একটি গাফিলতি রয়েছে। সে কারণে গাজীপুরবাসী কষ্ট করছেন। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও যোগাযোগ মন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, যেকোনো মুল্যে দ্রুত গাজীপুরের এই সড়কটির দুর্ভোগ সমাধান করা হয়। যদি ঠিকাদারদের কোনো গাফিলতি থাকে তবে আমরা সরাসরি বসতে চাই, আমরা সমাধান চাই। মানুষ যাতে চলাচল করতে পারেন সেটি আমরা চাই।

বিআরটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে গাজীপুর থেকে রাজধানীর বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়কে গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট) আওতায় দেশের প্রথম বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প শুরু হয়। সে সময় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও প্রকল্পের মেয়ার ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পের নির্মাণ কাজের ব্যয় দ্বিগুণ (৪ হাজার ২৬৪ কোটি ৮২ লাখ ১৪ টাকা) করা হয়। এরপর আরও দুই দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময় সীমা করা হয়। ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এডিবি, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল অ্যানভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (ডিইএফ) অর্থায়ন করছে।

এদিকে, শনিবার (১৯ জুন) দুপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের গাজীপুর অংশের বেহাল পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেছেন, আগামী তিনদিনের মধ্যে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশের সড়কের সমস্ত খানাখন্দ ও গর্ত রিপেয়ারিং (মেরামত) করা হবে। এরজন্য ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেশি লোক নিয়ে হলেও ২৪ ঘণ্টা কাজ করে এগুলো রিপেয়ারিং করতে হবে। তিনদিন পর আমি আবার এখানে আসবো।

তিনি বলেন, এই সড়কে ২৯০টি পিলার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মাত্র ১৮৯টি হয়েছে। এদিকে ১৬৪টি স্প্যান বসানোর কথা হয়েছিল কিন্তু মাত্র ২২টি স্প্যান বসানো হয়েছে। ইতিমধ্যে এই অংশের ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে। কিন্তু এই কাজে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি, এটা জানি। তবে সচেতন রয়েছি।