তাহলে রিসা-সাথীদের ভরসা কে?

আগস্ট ৩০, ২০১৬ ১২:২২ দুপুর

অনলাইন ডেক্সঃ

একজনের নাম সুরাইয়া আক্তার রিসা। আরেকজন সাথী আক্তার। দুজনই চতুর্দশী কিশোরী। একজনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যজন নিজেই তার প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। রিসাকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। ওবায়দুল নামের এক দরজির বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে।

অন্যজন চাঁদপুরের মেয়ে সাথীর ঘটনা ভিন্ন। স্কুলের ফি দিতে না পারায় তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। ফি দিতে অপারগ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সাথীকে এক ঘণ্টা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখেন এক শিক্ষক। সাথীর মা শায়লা বেগমের অভিযোগ, এই অপমানে গলায় দড়ি দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেয় মেয়েটি।

রিসা থাকত রাজধানী ঢাকায়, সাথীর ঠিকানা চাঁদপুরের গ্রামে। এই দুই চতুর্দশী দুটি ভিন্ন জায়গার বাসিন্দা হলেও কৈশোরের স্বভাবসুলভ আচরণ থেকে ভিন্ন নয়। যেকোনো মানুষের জীবনে ১৩-১৪ বছর বয়সটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়টা থাকে কৈশোরের সংবেদনশীলতা ও চপলতায় ভরপুর। তারা না পারে বড়দের দলে ভিড়তে, না পারে ছোটদের সঙ্গে মিশতে।

বিচার-বুদ্ধির চেয়ে আবেগে বেশি প্রভাবিত হয়। কাজেই তাদের আপনজন বা কাছাকাছি থাকা মানুষকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হয়। স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীরা বাবা-মায়ের পর সবচেয়ে বেশি সান্নিধ্য পায় শিক্ষকদের। কাজেই শিক্ষকদের ভূমিকা হওয়া উচিত আপনজনদের মতো। তাঁরা ভীতিকর দুর্জন না হয়ে হতে পারেন এমন এক আস্থাভাজন, যাঁর কাছে কিশোর বা কিশোরী খুঁজে পাবে পরম নির্ভরতার জায়গা।

খুঁজে পাবে ভবিষ্যৎ চলার পথের সঠিক দিকনির্দেশনা। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কারণে-অকারণে হেনস্তা করা হয়। এমনকি শারীরিক নির্যাতন করে কঠিন শাস্তিও দেওয়া হয়। এসব ঘটনা শিশু-কিশোরদের মনে প্রচণ্ড রকমের বিরূপ প্রভাব ফেলে। সাথী আক্তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করল তা।

অথচ ফি না দিতে পারায় তার কোনো দোষ নেই। এটা তার পরিবারের বা অভিভাবকের অক্ষমতা হতে পারে, কিন্তু সাথী আক্তার তো নির্দোষ। তাকে কেন হেনস্তা হতে হলো, যে অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে জীবনটাই দিয়ে দিল সে?
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীর সুস্থ মানসিক বিকাশ, নৈতিক মনোবল গঠনের আদর্শ জায়গা। সেখানে মূল চাবিকাঠি শিক্ষকদের হাতে। তাঁরাই যদি তুচ্ছ কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর খড়্গ ধরেন, তাহলে তারা কোথায় যাবে?

সাথীর ঘটনা কেবল তার পরিবারকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, তার সহপাঠী এবং ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরও অনেক শিক্ষার্থীকে যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আহত হয়েছেন এসব সহপাঠীর অভিভাবকেরা। সাথীর ঘটনা জেনে সমব্যথী হয়েছে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। মর্মবেদনায় পুড়েছেন আরও অনেক অভিভাবক। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, যাতে সামান্য ৮০ টাকা ফি দিতে না পারায় একজন সাথীর অমূল্য জীবন চলে যাবে।

একজন সাথীকে আমরা যেমন হারাতে চাই না, তেমনি চাই না উত্ত্যক্তকারী কারও ছুরিতে প্রাণ ঝরুক রিসার মতো একজন মায়াবতী কিশোরীর। রিসার মতো অনেক মেয়ে আছে, যারা পরিবারের আপনজনদের অলক্ষ্যে মোবাইল ফোনে, চিঠিতে, ফেসবুকে, রাস্তাঘাটে হামেশাই নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও হেনস্তার শিকার হচ্ছে। এসব কিশোরীর অনেকে লোকলজ্জা ও আপনজনদের কাছে উল্টো নাজেহাল হওয়ার ভয়ে ঘটনাগুলো চেপে রাখে। ভাবে, আপনা-আপনি এ ঝামেলা চুকে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।

বরং ঘটনা আরও জটিল হলে, জলঘোলা হয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো হলে, এমন সময় ঘটনা প্রকাশ পায়, যখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। কিশোরীদের আমরা এমনভাবে গড়ে তুলি যে তারা অনেকটা ভীরু স্বভাবের হয়ে ওঠে। প্রেম-ভালোবাসার বিষয়ে তারা থাকে ভারি স্পর্শকাতর। এ ক্ষেত্রে তারা সহজে মুখ খুলতে চায় না। এ জন্য কিশোরীদের আপনজনদের এ ব্যাপারে সজাগ থাকাটা খুব জরুরি।

কার কাছ থেকে তার কাছে ফোন আসছে, কেউ তাকে গোপনে বা প্রকাশ্যে বিরক্ত করছে কি না, কেউ তার মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়েছে কি না, এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতনতা তাকে অনেক ঘোর বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

আমরা চাই না আমাদের রিসা ও সাথীরা এভাবে অপঘাতে ঝরে যাক। রিসা ও সাথীরা এই স্বাধীন দেশে আমাদের সুরক্ষার ছায়াতলে নিরাপদে বেড়ে উঠবে—এটাই আমাদের কাম্য।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*