তামাক পণ্যে উচ্চহারে করারোপ না করার সুপারিশ প্রতিমন্ত্রীর

May 31, 2016 9:16 am

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২০৪০ সাল নাগাদ তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়ে তামাকের ওপর বর্তমান শুল্ক-কাঠামো সহজ করে একটি শক্তিশালী তামাক শুল্কনীতি গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। যাতে তামাকজাত পণ্যের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সরকারের শুল্ক আয় বৃদ্ধি পায়। একই লক্ষ্যে সব ধরনের তামাক পণ্যে উচ্চহারে করারোপের দাবি তুলেছে তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো। অথচ,সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী তামাক পণ্যে উচ্চহারে করারোপ না করার জন্য রাজস্ব বোর্ডে ডিও লেটার দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে ।

তামাক বিরোধীসংগঠনসহ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাকখাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায় তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে তার দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৮ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বিড়ির ওপর কর আরোপ না করতে অর্থমন্ত্রীকে দেওয়ার জন্য রাজস্ব বোর্ডে একটি ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। সেখানে সিগারেটের ৪র্থ স্লাব বাতিল, বিড়ি শিল্পের ওপর ধার্যকৃত অগ্রিম আয়কর বাতিলসহ বিড়ির ওপর আরোপিত সম্পূরক কর সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য তিনি সুপারিশ করেছেন অর্থমন্ত্রীকে। মন্ত্রীর এই ডিও লেটার দেওয়াকে নীতি-নৈতিকতাবিরোধী বলছেন তামাকবিরোধী সংশ্লিষ্টরা।বাংলাদেশ এফসিটিসিতে (ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল)স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর অন্যতম। সংসদ সদস্যরা সরকারের অংশ। সেই অংশ হিসেবে একজন মন্ত্রীর তামাক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকার কথা নয়, প্রমোট করা কিংবা তামাক কোম্পানির পক্ষ নিতে পারেন না বলেন সিটিএফকের গ্রান্টস ম্যানেজার ডা. মাহফুজুর রহমান ভূইয়া।

dha50
অপরদিকে, দ্য ইউনিয়নের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, সরকার যেখানে তামাক নিয়ন্ত্রণে অঙ্গীকারাবদ্ধ সেখানে তামাক কোম্পানির পক্ষে ডিও লেটার দেওয়া একজন মন্ত্রীর জন্য সমীচীন নয়।

তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার মতে, এফসিটিসি স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবলিগেশন রয়েছে যে, এফসিটিসির ৬ নম্বর ধারায় বলা আছে, তামাক পণ্যের চাহিদা কমাতে রাষ্ট্রসমূহ কর পদক্ষেপ নেবে, তাতে তামাকপণ্যের দাম বাড়বে এবং আর্টিকেল ৫ দশমিক ৩ অনুসারে তামাকপণ্যের ব্যবহার সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির পক্ষপাত করবে না রাষ্ট্র, বরং জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের দেশে এরকম আইন নেই জানিয়ে তামাক বিরোধীরা বলছেন, এফসিটিসির এই ধারা অনুসরণ করে বাংলাদেশেও নীতিমালা করা দরকার, যাতে সরকারের কোনও প্রতিনিধি তামাক কোম্পানির পক্ষপাত না করতে পারেন।

প্রজ্ঞার মতে, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয় এবং কর কাঠামো সহজ করা হয়। কোনও মন্ত্রী তার এই নির্দেশের বাইরে যেতে পারেনা, গেলে সেটা প্রধানমন্ত্রীকে অমান্য করা হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের দেওয়া ডিও লেটার

যদিও গত ৯ মে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান আসন্ন বাজেটে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে সব ধরনের তামাকজাত পণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছিলেন। অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তামাকমুক্ত হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সে লক্ষ্যেই ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী আগামী বছরে টোব্যাকো-ট্যাক্স সিস্টেম বদলানোর কথা চিন্তা করছেন, একইসঙ্গে স্লাব নির্ভর (মূল্যস্তর ভিত্তিক কর প্রথা) কর ব্যবস্থা না রাখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী। একইসঙ্গে গত ১২ মে এনবিআর থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে বাজেট কাঠামো উপস্থাপন করা হয় প্রাথমিক অনুমোদনের জন্য সেখানেও ইউনিফাইড ট্যাক্স সিস্টেম প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সে বৈঠকে এনবিআরসহ অর্থমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন, সেখানে অর্থমন্ত্রী নিজেই এই আউটলাইন উপস্থাপন করেছেন।

অথচ সিগারেটের ওপর স্তর ভিত্তিক কর-কাঠামো তুলে দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে সব স্তরই বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে রাজস্ব বোর্ডের এক বিশ্বস্ত সূত্র জানায়।

একইসঙ্গে কোনও এক অজানা কারণে অর্থমন্ত্রী তার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন একটি সূত্র। সূত্রটি আরও জানায়, সিগারেটের উচ্চ এবং প্রিমিয়াম স্তরে মাত্র ১ শতাংশ কর বৃদ্ধির সুপারিশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সিগারেটের নিম্ন স্তরে দাম বৃদ্ধি করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেট ১৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৭ টাকা করার প্রস্তাব করলেও অর্থমন্ত্রী সেই প্রস্তাব পরিবর্তন করে ২২ টাকা নির্ধারণ করেছেন।

অথচ সব ধরনের তামাকপণ্যে একক করারোপ এবং কমদামি সিগারেটের ওপর কর বৃদ্ধি করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অর্থমন্ত্রী নিজেই এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, গত একবছরে মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি বিবেচনায় নিলে এই প্রস্তাব চরম জনস্বাস্থ্যবিরোধী। এর ফলে এই স্তরের সিগারেটের ভোক্তারা বাজেটের পর আরও কম দামে একই পরিমাণ সিগারেট কিনতে পারবে।

বাংলাদেশে তামাকের ওপর শুল্ক-কাঠামো অত্যন্ত জটিল উল্লেখ করে ড. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, এতে করে কর ফাঁকি দেওয়া সুবিধা হচ্ছে এবং বেশি দামি সিগারেটের চেয়ে কম দামি সিগারেটে মানুষ সুইচ করতে পারে। কর বৃদ্ধির মাধ্যমে যেন দামটা বাড়ে এবং সেই বাড়াটা যেন সব স্তরের সিগারেটের ওপর আসে।

অপরদিকে, বাংলাদেশ ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে)- এর গ্রান্টস ম্যানেজার ডা. মাহফুজুর রহমান ভূইয়া বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করতে হয়, তাহলে এখন যে গতিতে অর্থমন্ত্রী এবং রাজস্ব বোর্ড কাজ করছে সেভাবে এটা সম্ভব নয়। তাদের গতি খুবই শ্লথ। অপরদিকে, রাজস্ব বোর্ড বলছে- স্তর প্রথা বিলোপ করবে, কিন্তু তারা যে এখন মধ্যমস্তরকে বিলোপ করেছে সেই স্তর এখনোও বর্তমান নেই। এটা একটা আইওয়াশ দেওয়া হলো সরকারসহ আমাদেরকে। অপরদিকে, ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ২৭ টাকা থেকে কমিয়ে ২২ টাকার জন্য অর্থমন্ত্রী সুপারিশ করেছেন। এখানে যে রাজস্বটা কমে গেল, এটা কেন করা হলো সেটা অর্থমন্ত্রীই ভাল জানেন, আমরা জানি না বলেন মাহফুজুর রহমান ভুইয়া।

অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান বলেন, ‘সিগারেট-বিড়িসহ কোনও তামাকজাত পণ্যেই মূল্যভিত্তিক স্তরপ্রথা থাকা উচিত নয়- এটা আমি বারবার বলেছি। স্তরপ্রথা থাকলে যারা এসব তামাকপণ্যের বিক্রেতা রয়েছে তারাও ঘাপলা করে এবং যারা এর ভোক্তা তারা নিচের দিকে নেমে যায়। আমি মনে করি, এসব কারণে মূল্যস্তর প্রথা তুলে দেওয়া উচিত।’

Please follow and like us:

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*