বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাসে তাজউদ্দীন আহমদ

জুলাই ৬, ২০১৬ ৫:২৬ সকাল

অনলাইন ডেক্সঃ

তাজউদ্দীন আহমদ একটি ইতিহাস, একটি আদর্শের নাম। তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাসে অনন্য ভূমিকা পালনকারী আলোকিত রাজনীতিবিদ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের নিপূণ শিল্পী, দক্ষ কারিগর। তাঁর মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা, নিষ্ঠা এবং পরিচ্ছন্ন রাজনীতি তাঁেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মহিমান্বিত করেছে। মানবতা ও আদর্শবাদ তাঁর চরিত্রকে করেছে অসাধারণ। জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সেবা ছিল তাঁর রাজনীতির মূল মন্ত্র। আর্তেও সেবায় তাঁর কোন ক্লান্তি ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ র্কীতি। বাংলাদেশের ইতিহাসের ঐতিহাসিক এই সন্ধিক্ষণে তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা ছিল অবিস্বরনীয় ও গৌরবদীপ্ত। চরম প্রতিকুলতার ভেতর দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে সব দিক দিয়ে সুসংগঠিত করে তোলেন। তাঁর সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ মাত্র ৯ মাসেই মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর ত্যাগ, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দেশপ্রেম জাতিকে অনুপ্রানিত করে। স্বাধিনতা যুদ্ধে তাঁর সফল ভূমিকা ও অবদান চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।
dha1306
তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের জৈষ্ঠ্য কন্যা শারমিন আহমদ লিখিত বহুল আলোচিত, পাঠক নন্দিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ — গ্রন্থের তৃতীয় পর্বে ‘ দুর্বার প্রতিরোধ’ – শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীন আহমদের বুদ্ধিদৃপ্ত সাহসী ভূমিকার বিশদ বর্ণনা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে (৫৯-৬০ পৃষ্ঠায়) তিনি লিখেছেন- , ‘‘ ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করলেন।আলোচনার আবরনে অপারেশন সার্চলাইট গণহত্যার নীল নকশা তখন সম্পন্ন । পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি ২৫ মার্চের ভয়াল কালোরাতে আব্বু গেলেন মুজিব কাকুকে নিতে । মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন, সেই ব্যাপারে আব্বু মুজিব কাকুর সাথে আলোচনা করেছিলেন। মুজিব কাকু সে ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী আতœগোপনের জন্য পুরান ঢাকায় একটি বাসাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল। বড় কোন সিদ্ধান্ত সস্পর্কে আব্বুর উপদেশ গ্রহনে মুজিব কাকু ্এর আগে দ্বিধা করেননি। আব্বুর, সে কারনে বিশ্বাস ছিল যে, ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুজিব কাকু কথা রাখবেন। মুজিব কাকু, আব্বুর সাথেই যাবেন। অথচ শেষ মূর্হুতে মুজিব কাকু অনড় রয়ে গেলেন। তিনি আব্বুকে বললেন, ‘ বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশুদিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি।’ মুজিব কাকুর তাৎক্ষণিক এই উক্তিতে আব্বু বিস্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এদিকে বেগম মুজিব ঐ শোবার ঘরেই সুটকেসে মুজিব কাকুর জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখতে শুরু করলেন। ঢোলা পায়জামায় ফিতা ভরলেন। পাকিস্তানী সেনার হাতে মুজিব কাকুর সেচ্ছা বন্দি হওয়ার এইসব প্রস্তুতি দেখার পরও আব্বু হাল না ছেড়ে প্রায় এক ঘন্টা ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরন টেনে মুজিব কাকুকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন। তিনি কিংবদন্তি সমতুল্য বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উদাহরণ তুলে ধরলেন, যাঁরা আতœগোপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু মুজিব কাকু তাঁর এই সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। আব্বু বললেন যে, পাকিস্তান সেনা বাহিনীর মূল লক্ষ্য হলো, পূর্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ রূপেই নেতৃত্ব¡ শূণ্য করে দেওয়া। এই অবস্থায় মুজিব কাকুর ধরা দেওয়ার অর্থ হলো আতœহত্যার শামিল। তিনি বললেন, ‘ মুজিব ভাই, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হলেন আপনি। আপনার নেতৃত্বের উপরই তারা সম্পূর্ণ ভরসা করে রয়েছে।’ মুজিব কাকু বললেন, ‘ তোমরা যা করবার কর। আমি কোথাও যাবনা।’ আব্বু বললেন, ‘ আপনার অবর্তমানে দ্বিতীয় কে নেতৃত্ব দেবে এমন ঘোষণা তো আপনি দিয়ে যাননি। নেতার অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তি কে হবে, দলকে তো তা জানানো হয়নি। ফলে দ্বিতীয় কারো নেতৃত্ব প্রদান দূরূহ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে এক অনিশ্চিত ও জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।’ আব্বুর সে দিনের এই উক্তিটি ছিল এক র্নিমম সত্য ভবিষ্যদ্বাণী।

dha1307

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্বু স্বাধীনতার ঘোষনা লিখে নিয়ে এসেছিলেন এবং টেপ রেকর্ডার ও নিয়ে এসেছিলেন। টেপে বিবৃতি দিতে বা স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর প্রদানে মুজিব কাকু অস্বীকৃতি জানান। কথা ছিল যে, মুজিব কাকুর স্বাক্ষরকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমানে শেরাটন) অবস্থিত বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং তাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। আব্বু বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কারন কালকে কী হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তা হলে কেউ জানবে না, কী তাদের করতে হবে। এই ঘোষনা কোন না কোন জায়গা থেকে কপি করে আমরা জানাব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তা হলে সেটাই করা হবে। ’ মুজিব কাকু তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানীরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে। ’ আব্বুর লেখা ঐ স্বাধীনতা ঘোষনারই প্রায় হুবহু কপি পরদিন আর্ন্তজাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ধারনা করা যায় যে, ২৫ মার্চের কয় দিন আগে রচিত এই ঘোষনাটি আব্বু তাঁর আস্থাভাজন কোন ছাত্রকে দেখিয়ে থাকতে পারেন। স্বাধীনতার সমর্থক সেই ছাত্র হয়তো স্ব-উদ্যোগে বা আব্বুর নির্দেশেই স্বাধীনতার ঘোষনাটি বর্হিবিশ্বের মিডিয়ায় পৌঁছে দেন। মুজিব কাকুকে আত্মগোপন বা স্বাধীনতা ঘোষণায় রাজি করাতে না পেওে রাত নয়টার দিকে আব্বু ঘরে ফিরলেন। বিক্ষুব্ধ চিত্তে । আম্মাকে সব ঘটনা জানালেন। মুজিব কাকুর সঙ্গে পুরান ঢাকার পূর্ব র্নিধারিত গোপন স্থানে আব্বুর আতœগোপনা করার কথা ছিল। মুজিব কাকু না যাওয়াতে পূর্ব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ’’

dha1308

বাঙালী জাতির এই দুঃসময় ও ক্রান্তিলগ্নে সমগ্র জাতি যখন দিশেহারা তখন ধীরচেতা ও প্রখর মেধাবী দুরদর্শী রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতেই স্বাধীনতার পত্যক্ষ নেতৃত্ব ও মূল কান্ডারীর দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঘটিত হয় ঐতিহাসিক মুজিব নগর অস্থায়ী সরকার। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন অস্থায়ী সরকারের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার। তিনি ছিলেন যুদ্ধকালীন সেই সরকারের সফল প্রধানমন্ত্রী।

dha1310

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে বহু দেশী-বিদেশী সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধা এবং আইন সভার সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন ‘মুজিব নগর সরকার’ আনুষ্ঠানিক ভাবে শপথ গ্রহন করেন।

dha1311

এক বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদ প্রবাসী সরকার গঠনের চিন্তা ও পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর এই দুরদর্শি ও সময় উপযোগি চিন্তার মধ্যে লুকিয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য। মুজিব নগর অস্থায়ী সরকারের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল-মুক্তিযুদ্ধকে সুষ্ঠু ও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করে দ্রুত দেশকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করা। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ও প্রশিক্ষন প্রদান করা, প্রচার-প্রচারনার মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাকান্ড, ধবংস লীলা ও নির্যাতন, নিপিড়ন সম্পর্কে ধারনা প্রদান এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহনকারী লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা, বিদেশী রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন এবং বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। তাজউদ্দীন আহমদ মুজিব নগর সরকারের উদ্দেশ্যকে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে তরান্বিত করেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদেও নেতৃত্বে মুজিব নগর সরকার গঠিত হলে দেশের ছাত্র যুবক, কৃষক শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে জেগে উঠে আশার আলো। অস্থায়ী সরকার বাংলাদেশকে এগার টি সেক্টরে বিভক্ত করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেয়। সেদিন এই অস্থায়ী মুজিব নগর সরকার মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক ভাবে পরিচালনা করা , মুক্তিযুদ্ধেও মনোবল ঠিক রাখা এবং বিভিন্ন সেক্টর ও গেরিলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগনকে উদ্দীপ্ত করে তুলেছিল। তাজউদ্দীন আহমদ দিন রাত ভারতের মাটিতে বিভিন্ন শরনার্থী শিবির, মুক্তিযুদ্ধাদেও প্রশিক্ষন কেন্দ্র ও রণাঙ্গন ঘুরে বেড়িয়েছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে হয়েছিল অনেক ষড়যন্ত্র। এসব গভীর ষড়যন্ত্র সুকৌশল ও দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করেই তিনি মুক্তিযুদ্ধকেসফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। স্বাধীনতার পরেও তার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। বার বার তাকে মূল্যায়নের পরিবর্তে অবমূল্যায়ন করা হয়।

dha1312

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর গঠিত মুজিব মন্ত্রী পরিষদে তাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। অর্থ মন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশে আতœ নির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার আপ্রান চেষ্টা করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও সফল অর্থ মন্ত্রী। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর এক অজানা কারনে তাঁেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

অ্যান্থনী মাসকারেনহাস ছিলেন একজন বরেণ্য সাংবাদিক। এই বিদেশী সাংবাদিক ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছিলেন। তাঁর ‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ’ রচনাগ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর সৃষ্ট ‘ বাংলাদেশ ঃ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ ( বাংলাদেশ ঃ রক্তের ঋণ) বহু তথ্য সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। এ গ্রন্থে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। অ্যান্থনী মাসকারেনহাস তাঁর ‘বাংলাদেশ ঃ রক্তের ঋণ’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২৬) লিখেছেন, ‘‘ শেখ মুজিব ঠিকই তাজউদ্দীনকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে নিজেই প্রধান মন্ত্রী হয়ে বসলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র প্রধানের পদটিও যেন তাঁর জন্যে পথের কাঁটা না হয়, সে ব্যাপারেও তিনি নিশ্চিত হয়ে নিলেন। আর সে কারনে তিনি অতিশয় ভদ্র এবং চরম ভাবে অনুগত একটি অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বাছাই করলেন। তিনি হলেন , বিচারপতি আবু সাঈ চৌধূরী। ’’

অ্যান্থনী আরো লিখেছেন, (পৃষ্ঠা ২৫) ‘‘ প্রেসিডেন্ট এর পদটি শেখ মুজিবের জন্য খালি রাখা হয়েছিল। প্রকৃত পক্ষে , লন্ডনে পৌঁছলে তাঁকে প্রেসিডেন্ট হিসেবেই সংবর্ধনা জানানো হয়। এবং সকলেরই এ¦ই ধারনা ছিল যে, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবেই দেশের কার্যভার পরিচালনা করে যাবেন। কিন্তু ওয়েষ্টমিন্সটার ষ্টাইলের সরকার প্রধান শেখ মুজিব হলেন, দেশের শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষমতা দিতে হবে প্রধানমনস্ত্রীর উপর। তাহলে তাজউদ্দীন আহমদ সে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়েন।’’

dha1313

এ পৃষ্ঠার শেষ প্যারায় তিনি লিখেছেন, ‘‘ প্রশাসন পরিচালনার যথেষ্ট দক্ষতা তাজউদ্দীন আহমদের ছিল। কিন্তু তাঁর সিনিয়র সহকর্মীরা কখনই তা পুরোপুরি মেনে নেননি। এমনকি মুজিব নগর সরকারের দিন গুলোতেও তাজউদ্দীনকে ভারতীয় সহায়তায় উচ্চপদে আসীন করা হয়েছে বলে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তাজউদ্দীনের দক্ষতা থাকলেও তারা তাকেঁ ‘ভূঁইফোড়’ লোক বলে মনে করতেন। ‘ভারত পন্থী’ বলে একটি র্দুনাম তাঁর নামের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে তার অবস্থানকে অসুন্দর করে তোলা হলো।”

তাজউদ্দীন আহমদ মানুষ হিসাবে ছিল অনেক বেশী ধীরস্থির এবং স্বাধীনচেতা। তিনি মনে প্রানে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন বাকশাল করার জন্য জনগন আমাদের ভোট দেয়নি। গণতন্ত্র নস্যাৎ করে বাকশাল প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন তিনি। তিনি কখনো এক নায়কতান্ত্রিক ধরনের শাসনকে পছন্দ করতেন না। গণতন্ত্রের মাধ্যমেই মানুষের মুক্তির পথ খুঁজতেন । তাজউদ্দীন আহমদ সামনা সামনি কথা বলতে পছন্দ করতেন। গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। সত্য প্রকাশে ছিলেন আপোষহীন। ভয় করার কথা তাঁর জিবনের অভিধানে কখনো ছিল না। তাঁর মনে ছিল অত্যন্ত সাহস। কিন্তু অসত্য ও ষড়যন্ত্রের কাছে পেরে উঠেননি। তিনি সব সময় স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ, সত্যিকার শুদ্ধ, সৎ, উন্নত সমাজ-সংস্কৃতি ও সুস্থ রাজনীতির কথা চিন্তা করতেন।

dha1314

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য মন্ত্রী ও পরে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান মন্ত্রী আতাউর রহমান খান, সিমিন হোসেন রিমি সম্পাদিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ ঃ আলোকের অনন্তধারা’- গ্রন্থে তার এক স্মৃতিচারনমূলক লেখায় (পৃষ্ঠা ১৯-২০) বলেছেন, ‘‘সত্যের পথে তাঁেক কেউ সাহায্য করে নাই। মুজিবুরকে সবাই ভয় পেত, তাই ভয়ে কেউ তাজউদ্দীনকে সমর্থন করে নাই। করলে তাজউদ্দীনের অবস্থা অন্যরকম হতো। তাজউদ্দীনের উপর হস্তক্ষেপ করা, স্বৈরাচারীভাব, এগুলো তাজউদ্দীন মানতনা বলেই শেষ পযন্ত তাঁকে সরিয়ে দিল। তাঁকে রাখলই না, বাদ দিয়ে দিল।’’

তাজউদ্দীন ছিলেন মনেপ্রানে জাতীয়তাবাদী একজন মানুষ, যাঁর কাছে দেশের মুক্তির চাইতে আমার চোখে তাজউদ্দীন আহমদবড় আর কিছু ছিল না। সম্ভব ছিল না তাজউদ্দীনকে দিয়ে অন্যায়, অন্যায্য বাঁকা কিছু করানো। তাই ষড়যন্ত্র শুধু একমূখী ছিল না, ছিল বিভিণœ মূখী, আর ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় । এব্যাপারে তাজউদ্দীন কন্যা সিমিন হোসেন রিমি তার গবেষনামূলক লেখা ‘আমার ছোট বেলা ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ’- গ্রন্থে (পৃষ্ঠা- ১৪০) লিখেছেন, ‘‘ ১৯৭৪-এ এসে পরিস্কার বুঝতে পারলাম আব্বুর স্বপ্ন স্বপ্নই রয়েগেছে। আমার মনে হয় অনেক কিছুই করতে চান তিনি। কিন্তু তাঁর চারিদিকে কেমন যেন যন্ত্রনায় ভরা রুদ্ব দ্বার। আব্বু যে সমস্ত কথা বলতেন তা থেকে পরি¯কার বুঝা যেত, আব্বুর জীবনের পরম সাধনা ছিল যে মুক্তিযুদ্ধ, তার পরবর্তী অনেক ঘটনা, অনেক কাজকেই তিনি দেশের স্বার্থে, দেশের অকল্যান হতে পারে আশঙ্কায় সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। স্বাধীনতা লাভের পরপরই যা যা হতে পারে বলে আব্বুর আশঙ্কা ছিল তাই যেন আব্বু এক এক করে ঘটতে দেখছিলেন। ’’এ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-১৪৪-১৪৫) সিমিন হোসেন রিমি তার পিতা তাজউদ্দীন আহমদের মন্ত্রী সভা থেকে পদত্যাগ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের সাথে র্দীঘ আলোচনার সময় আব্বু বললেন ঃ ঝড় হচ্ছে বলে মরুভূমিতে উটপাখির মত মাথা গুঁজে রাখলে চলবে না। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদেরকে সব সকিছুর মোকাবেলা করতে হবে। পরদিন সমস্ত পত্রিকায় আব্বুর বক্তব্য গুলো বিভিন্ন শিরোনামে ছাপা হলো।

মাঝে মধ্যে খবরের কাগজে দেখতাম আব্বুর দল থেকেই বিভিন্ন বক্তৃতায় বলা হচ্ছে, যারা দলের ভেতরে থেকে দলে সমালোচনা করে তাদের দলে থাকবার কোন অধিকার নেই-এমন ধরনের সব কথাবার্তা । আমার বুঝতে একটুও অসুবিধা হতো না যে, এই কথাগুলো আব্বুকে উদ্দেশ্য করেই বলা। আমরা কিছুটা আঁচ করতে পারছিলাম। আব্বু পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটলো অক্টোবরের ২৬ তারিখে। প্রতিদিনের মত যথারীতি সকালে আব্বু সচিবালয়ে গেলেন। বাসায় ফিরে এলেন দুপুর ১ টার কিছু পরে। আমি কি একটা কাজে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নামছিলাম। হঠাৎ সেখান থেকে শুনি আব্বু পিয়ন আমির হোসেনকে বলছেন, ছাদ থেকে পতাকা নামাতে বল। আমির হোসেনের কন্ঠ পেলাম ঃ স্যার ! আব্বু বললেন, আমি পদত্যাগ করে এসেছি।’’
তাউদ্দীন কন্যা সিমিন হোসেন রিমি তাঁর বাবার পদত্যাগের পর তার ছোট বেলার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা, কষ্টের কথা ব্যক্ত করেছেন- যা পড়লে পাঠক মনকে নাড়া না দিয়ে পারবে না। সিমিন হোসেন রিমি ‘আমার ছোট বেলা, ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ’ – গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১৪৬-৪৭) লিখেছেন, সরকারের প্রেসনোটের বরাতে কয়েকটি কাগজ লিখেছে, ‘‘ বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তাজউদ্দীন আহমদকে পদত্যাগ করানো হলো। ’’ আমি হতভম্বের মত পত্রিকা হাতে বসে থাকি অনেকক্ষন। আমার মাথায় কিছুতেই ঢোকে না, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থটা কি ? আমি ভাবতে থাকি যে মানুষটা তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গ করেছেন এই জাতীর জন্য, এই দেশের মানুষের জন্য যে মানুষটা মুক্তিযুদ্ধকে জীবনপন বাজি রেখে সংগঠিত করলেন, নেতৃত্ব দিলেনঅবিচল নিষ্ঠার সাথে, বিজয়ের গৌরবকে যিনি বিলিয়ে দিলেন অকাতরে, তাঁর নীরব প্রস্থানে ও সামান্যতম কৃতজ্ঞতার বদলে, এই প্রাপ্তি ? আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না এটা। এই প্রথমবারের মত আব্বুর জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হলো। আমার এই কষ্টের কোন মাত্রা নেই। এই কষ্টের সাথে আমি কোন দিন ও পরিচিত ছিলাম না। আব্বুর ভেতরটা অনুভব করতে গিয়ে বার বার কান্নায় আমার চোখ বুজে এলো।’’ পদত্যাগের পরের পরিস্থিতিও তিনি তার বইতে তুলে ধরেছেন। এব্যাপারে তিনি লিখেছেন, ‘‘আরো শুনলাম , আব্বুর পদত্যাগের দিন ২৬ তারিখে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে সর্তক করে রাখা হয় এবং এই সমস্ত সংস্থার লোকজন সাদা পোশাকে সচিবালয়কে ঘিরে রাখে। এমনকি মানুষের ভিড়ের মধ্যে আমাদের বাসাতেও ঐ সমস্ত লোকেরা নজর রাখছিল।’’

পচাত্তরের পর আওয়ামীলীগৈর দুঃসময়ে দলের হাল ধরেছিলেন তাজউদ্দীনের ন্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসলে তাজউদ্দীন ভক্তরা আশায় বুক বেধেঁছিল জোহরা তাজউদ্দীনকে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু তিনিও তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন পায়নি। তাজউদ্দীনের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আফছার উদ্দীন আহমদকে প্রতিমন্ত্রী করা হলেও এক ঠুনকু অভিযোগে তাকেও মন্ত্রী সভা থেকে বিদায় নিতে হলো। তাজউদ্দীন আহমদের একমাত্র পুত্র পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব তানজীম আহমদ সোহেল তাজ’কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত ও রহস্যজনক কারনে তিনিও মন্ত্রী সভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে সোহেল তাজ জাতীয় সংসদের সদস্য পদ থেকেও অব্যাহতি নিয়ে বর্তমানে রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করছেন।

এতকিছুর পরও জাতীর দুঃসময়ের কান্ডারী তাজউদ্দীনের তুলনা তাজউদ্দীনই । তাঁকে যারা অবমূল্যায়ন করবে এবং তাঁর অবদানকে যারা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করবে তারাই ইতিহাসে অবমূল্যায়িত হবে।

যে মানুষটি উপাধি পেয়েছিল বাংলাদেশের বঙ্গতাজ, যিনি ছিলেন এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বদানকারী, রণাঙ্গনের সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি আজীবন মাটি, মানুষ ও দেশের কল্যাণ নিয়ে ভেবেছেন, গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছেন, যে ব্যক্তিটি সুখি সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, সেই প্রচার বিমূখ, ত্যাগী, আর্দশের মূর্ত প্রতিক ও খাটি দেশপ্রেমিক মানুষটিকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় বন্দি অবস্থায় কারাগারের সব নিয়ম লংঘন করে মধ্যযুগের বর্বরতার চুড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিষ্ঠুর ভাবে পাষাণের মত হত্যা করে ঘাতকের দল।

এই মৃত্যু তাজউদ্দীনকে করে মৃত্যুঞ্জয়ী, তাঁকে করে আরো বেশী মহিমান্বিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসে তাজউদ্দীন উজ্জ্বল তারকা হয়ে ফুটে উঠে। তার জীবনাদর্শ পূর্ণিমার চাদেঁর আলোর মত ছড়ায় সমগ্র দেশে। স্বাধীনতার কারিগর তাজউদ্দীনের বর্ণাঢ্য আর্দশিক কর্মময় জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে তার অনন্য-অসাধারণ ভূমিকাকে পাথর চাপা দিয়ে ঢেকে রাখলেও কু-চক্রী মহলের গভীর ষড়যন্ত্র ভেদ করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত জ্বলে উঠবে তাঁর গৌরবদীপ্ত ভূমিকা। অবমূল্যায়নের প্রাচীর ভেদ করে সত্য সন্ধানীদের গভীর হৃদয়ে স্থান করে নিবে তাজউদ্দীনের আর্দশ।

লেখক: শামসুল হুদা লিটন
কবি, সাংবাদিক, কলামিষ্ট

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*