জঙ্গিবাদ আন্তর্জাতিক সমস্যা, দেশীয় কিংবা আঞ্চলিক সমস্যা নয়

July 11, 2016 7:26 am
Spread the love

অনলাইন ডেক্সঃ

জঙ্গিবাদ এখন আর কোন দেশীয় কিংবা আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিও কারও অজানা নয় বিংশ শতাব্দীর ৯০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীকে হটিয়ে নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সাম্রাজ্যবাদী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে আল-কায়দা ও তালেবান জঙ্গিদের অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ফ্রাংকেন্সটাইনের দানবে পরিণত করেছে। এই দানব এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল দেশ, নাগরিক ও ভূখণ্ডকে গিলে খেতে চায়। সবচাইতে আতংক ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এই হিংস্র মানবাতাবিরোধী দানবীয় গোষ্ঠী শান্তির ধর্ম ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করে ইসলাম ও মুসলমানদের কলঙ্কিত করছে।

আজ সারা পৃথিবীতে মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখা হয় বিশেষ করে পাশ্চাত্য দুনিয়ায়। এই সুযোগে বিশ্বের একক মোড়ল রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র “ওয়ার অন টেরর” –এর নামে সমগ্র দুনিয়ায় সন্ত্রাসের এক রাম রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। সন্ত্রাস দমনের নামে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লংঘন ও নাগরিক হত্যাকে দেশটি তার অধিকার ও দায়িত্ব বলে মনে করে।

পৃথিবীর অনেক মানুষ ও বিশ্লেষক এটি বিশ্বাস করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ ও আধিপত্য ধরে রাখার জন্য মার্কিন তাত্ত্বিক স্যামুয়েল ফিলিপ হানটিংটনের “ ক্লেশ অব সিভিলাইজেশন বা সভ্যতার দ্বন্দ্ব” তত্ত্বের আলোকে সারা দুনিয়ায় কখনো সন্ত্রাস লালন কিংবা কখনো সন্ত্রাস দমনের পৃথিবীকে সন্ত্রাসের এক উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে।

আর সে জন্যই পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ কখনো তালেবান, কখনো আল-কায়দা, আবার কখনো বা আইসের ভয়াবহতার সম্মুখীন হচ্ছে। যার সহজ টার্গেট সকল ধর্মের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ ও মুসলমানরা।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ সালে বর্তমান সময়ের সবচাইতে আলোচিত ও বর্বর জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এন্ড সিরিয়া (আইসিস)-এর উত্থানের পর পৃথিবীময় অস্ত্র বিক্রি প্রায় তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকে আমার লেখার উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করা নয়; বরং অতি সম্প্রতি গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গিগোষ্ঠীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কৌশল ও আমাদের নাগরিকদের কি ভূমিকা নেয়া উচিত সেটাই আজকের উদ্দেশ্য।

আগেই উল্লেখ করেছি পৃথিবীময় সংগঠিত জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এখন কোন দেশীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশও এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের করাল দেউয়ের বাইরে নয়। এটি আমাদের অজানা নয় বাংলাদেশের অনেক তরুণ বিংশ শতাব্দীর ৯০-এর দশকে আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থনে যুদ্ধ করেছিলেন। তারপর আফগান ফেরত সেই সব জঙ্গিরা স্লোগান দিয়েছিল “ আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান”।

এরপর ২০০১ সালে পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ তথা হুজির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারপর বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রথমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম তথা বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) আত্মপ্রকাশ করে।

এর ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হতে থাকে। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক রাজিব হায়দারকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে দেশে জঙ্গিরা প্রথম টার্গেট কিলিং শুরু করে। তারপর জঙ্গিরা বেছে বেছে এক এক করে লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক দীপন, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু, পীর, আলেম, পুরোহিত ও বিদেশী নাগরিকদের হত্যা শুরু করে। এসব হত্যাকাণ্ডে দেশে-বিদেশে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় উঠে। কিন্তু চলতি মাসের ১লা জুলাই রাজধানী ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে ৬-৭ জন তরুণের জঙ্গিদল রেস্টুরেন্টটিতে খেতে যাওয়া সকলকে জিম্মি করে এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। পবিত্র রমজান মাসে চারদিকে যখন আজানের ধ্বনি শুনা যাচ্ছে এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যখন তারাবির নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন মগজ ধোলাই করা এই তরুণরা ভয়ানক হত্যাকাণ্ডে উদ্যত হয়।

এই উন্মত্ত খুনিদের প্রতিরোধে এদের ছোড়া গ্রেনেডের আঘাতে প্রথম শহীদ হন রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন খান ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম। এছাড়া ৪০-৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। সারাদেশে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পরে। পুরো দেশের মানুষ জিম্মিদের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন। এমন জিম্মি ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম হওয়ায় পুলিশসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাবধানতার সাথে এগোতে থাকেন।

তাদের প্রথম টার্গেট ছিল আলোচনার মাধ্যমে জিম্মি দেশি-বিদেশি নাগরিকদের মুক্ত করা। তারপর জঙ্গিদের পক্ষ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার বিচক্ষনতা ও নির্দেশনায় সেনা-নৌ-বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে জিম্মি উদ্ধারে অপারেশন থান্ডার বোল্টে অভিযান পরিচালনা করেন। মাত্র ১৩ মিনেটের মধ্যে সন্ত্রাসীদের পরাভূত করা হয়। অভিযানে ১৩ জনকে জীবিত এবং ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত লোকজনের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি ও তিনজন বাংলাদেশি। বিদেশিদের মধ্যে ৯ জন ইতালির, ৭ জন জাপানের ও একজন ভারতের নাগরিক। অপর ছয়টি লাশ সন্ত্রাসীদের বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হয়। পরে তাদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া যায়। গুলশানের জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত সন্দেহভাজন হামলাকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন, খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েলের বাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ব্রিকুষ্টিয়া গ্রামে। তিনি ডিহিগ্রাম ডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ২০১৫ সালে আলিম (এইচএসসি সমমান) পাস করে ফাজিল শ্রেণিতে ভর্তি হন। রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, মীর সামেহ মোবাশ্বের স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল পাস করা, নিব্রাস ইসলাম মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বলের বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের কৈয়াগাড়ি গ্রামে।

সেদিন রাতে এ জঙ্গিরা মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র নামের স্লোগান “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিয়ে অমুসলিমদের উপর আক্রোশ নিয়ে রক্তস্রোত বইয়ে দেয়। অথচ অমুসলিমদের নিরাপত্তায় রাসূলুল্লাহ (সা: ) বলেছেন, “মনে রেখো যদি কোন মুসলমান কোন অমুসলিমের উপর নিপীড়ন চালায়, তাদের অধিকার খর্ব করে, তার কোন বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়, তাহলে কেয়ামতের দিন আমি আল্লাহ্‌র আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিমের পক্ষাবলম্বন করবো।” [ আবু দাউদ] অন্য একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা: ) আরও বলেছেন, “যদি কোন ব্যক্তি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিক বা মুসলিম দেশে অবস্থানকারী অমুসলিম দেশের অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে তবে সে জান্নাতের সুগন্ধও লাভ করতে পারবে না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধ ৪০ বৎসরের দূরত্ব থেকে লাভ করা যায়।” [ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস] পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে মহান আল্লাহ্‌ পাক বলেন, “ তোমাদের কাছে কোন প্রতিমা পূজারী মুশরিকও যদি ( বিপদে পড়ে) আশ্রয় চায়, তাকে আশ্রয় দিও, যেন সে আল্লাহ্‌র কালাম শুনতে পায়। অতপর (সে আল্লাহ্‌র কালামকে অস্বীকার করলেও) তাকে তার ( বিপদ কেটে যাওয়ার পর) নিরাপদ স্থানে পৌছে দিও। এটি এ জন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।”[সূরা তওবা: ৬]

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। শেখ হাসিনাই বর্তমান বিশ্বের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি বার বার জঙ্গি হামলার স্বীকার হয়েছেন। এবং এখনো জঙ্গিদের প্রধান টার্গেট হয়ে আছেন। তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে তার মহান পিতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাছ থেকে পেয়েছেন অসামান্য সাহস, দূরদৃষ্টিতা ও সাধারণের প্রতি কৃত্রিমতা বর্জিত ভালোবাসা। তিনি একদিকে বাংলাদেশকে যেমন উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে নিচ্ছেন, ঠিক তেমনি সাহসের তরবারি নিয়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধেও সর্বাত্মক যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছেন। তারপরও গুলশান জিম্মি খুন, টার্গেট কিলিং ও সর্বশেষ ঈদের দিন ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়ার ঈদ জামাতের পাশেই পুলিশের চেকপোস্টে আত্মঘাতী হামলায় দুই পুলিশ সদস্য ও দুই আত্মঘাতী জঙ্গিসহ পাঁচ জন নিহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে জঙ্গি দমনে রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জননিরাপত্তা ও জঙ্গি দমনে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে।
dha95
তাছাড়া এই উগ্রবাদীদের নির্মূলে রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি অভিভাবক ও দেশের সকল নাগরিকদের যার যার জায়গায় দায়িত্ব পালন করার আছে তা এখন সকলে উপলব্ধি করছেন। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর ডিএমপির পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, জঙ্গিদের নির্মূলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের কৌশল পরিবর্তন ও আরও আধুনিকায়ন করবে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তার কঠোর মনোভাব ও একই সাথে সামাজিক প্রতিরোধের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, পবিত্র রমজান মাসে একজন মুসলিম নামাজ বাদ দিয়ে মানুষ খুন করতে পারে না। এদের ধর্ম ইসলাম হতে পারেনা। এদের ধর্ম সন্ত্রাস। এছাড়া সন্তানদের বিপদগামী পথ থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের আরও যত্নবান হতে তিনি আহ্বান জানান। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জন সম্পৃক্ততার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

গুলশানে সংগঠিত জিম্মি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই বোধের সৃষ্টি করেছে যে উগ্রবাদী জঙ্গিদের ভয়াল থাবা থেকে এখন আর কেউই নিরাপদ নয়। ইতোপূর্বে কথিত নাস্তিক, লেখক, প্রকাশক, ব্লগার , পীর, আলেম, পুরোহিত ও বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডে সাধারণ জনগণ হয় নীরবতা পালন করেছে, অথবা এড়িয়ে গেছে, নয়তবা গোপনে উল্লসিত হয়েছে। কিন্তু গুলশান হত্যাকাণ্ড সবার বিবেক ও বোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে যেখানে দেশি-বিদেশি, মুসলিম-অমুসলিম কেউই জঙ্গিদের জিগাংসা থেকে রেহাই পায়নি। এ ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞে প্রায় পুরো দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে। গুলশানে নিহত ৫ জঙ্গির মধ্যে তিনজন দেশের নামকরা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শুধু তাই নয় তারা বেশ অভিজাত পরিবারের সন্তান বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের প্রচলিত ধারণা হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। কিন্তু এই উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক ও ধনী পরিবারের সন্তানরা জঙ্গিবাদের সাথে জড়িয়ে পড়ায় জঙ্গিবাদ সম্পর্কে প্রথাগত ধারণা উলট পালট হয়ে যায়। এ ঘটনার পর দেশের অধিকাংশ মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও কিছু মানুষ এখনো জঙ্গিবাদকে মনে প্রানে লালন এবং আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আস্কারা দিয়ে যাচ্ছেন। গত ৭ই জুলাই রাজধানীর ধানমণ্ডি শংকরের একটি মসজিদে ঈদের নামাজের পূর্বে মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান গুলশান হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ইসলামের নামে এসব জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী এবং নিজেদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হতে প্রত্যেক অভিভাবককে তিনি অনুরোধ করেন। এ মানবতার পক্ষে আহ্বানকেও তৎক্ষণাৎ কিছু জঙ্গিবাদের সমর্থক প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে থাকেন। তারপর ইমাম সাহেব নামাজের প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে তাদের নিবৃত্ত করেন।
dha97
পৃথিবীর যেকোন দেশে যখনই জাতীয় দুর্যোগের সম্মুখীন হয় তখন সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে। অথচ বাংলাদেশের মানুষ যখন গুলশানের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে উদ্বিগ্ন তখন দেশের সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথমে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দাবি করলেন। তারপর তিনি বলে বসলেন, সরকারের দমন-পীড়ন ও জুলুম-নির্যাতনের ফলে জঙ্গি হামলা সংগঠিত হচ্ছে এবং অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনই এ থেকে উত্তরণের উপায়। যদিও তিনি পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতি ইসলামীকে সাথে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়ায় অনেকেই এর আন্তরিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সুচিন্ত বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও দেশবিরোধী চক্রের সাথে কোন ঐক্য হতে পারে না। ঐক্য হতে হবে জনগণের মধ্যে। দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ ও বিশ্লেষক মনে করেন সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত এসব জঙ্গি হামলার সাথে আন্তর্জাতিক চক্র ও জামায়াত শিবির জড়িত রয়েছে। আর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিক্রিয়ায় মনে হচ্ছে তিনি এসব হত্যাকাণ্ডে মদদ দিচ্ছেন। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইসের অস্তিত্ব প্রমাণে অনলাইন ভিত্তিক মার্কিন জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষক পোর্টাল সাইট ইন্টেলিজেন্স আদা জল খেয়ে নেমেছে। রিতা কারজ নামে এক ইহুদী যার মালিক। এছাড়া অতি সম্প্রতি যেকোন জঙ্গি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসাও অনেকের দৃষ্টি এড়ায়নি। এখন অনেকের মনে জোর সন্দেহ বাংলাদেশ কি তথাকথিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের পরবর্তী টার্গেট? বাংলাদেশ কি পরিণত হবে পরবর্তী আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা সিরিয়ায়? এই শান্তি ভূমিতে কি বইবে রক্তগঙ্গা?

আমাদের মধ্যে বিদ্যমান অনৈক্য শত্রুদের সুযোগ করে দিচ্ছে। শত্রুদের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে পাল্টা পরিকল্পনার নিয়ে আমাদেরও জেগে উঠতে হবে। তাদের মানুষ খুনের পরিকল্পনাকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভণ্ডুল করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ের গুপ্ত খুন ও রাজধানীর গুলশানে জিম্মি করে মানুষ খুনসহ একের পর এক ঘটে চলছে দেশ, মানবতা ও ধর্মবিরোধী অপকর্ম। এই উন্মাদ খুনিরা তাদের আদর্শে ১০০ ভাগ কমিটেড। অথচ আমাদের আদর্শে কতভাগ কমিটেড আমরা যেটা আমরা প্রতিনিয়ত বুলি হিসেবে আওড়াই। এই ষড়যন্ত্রের পালক একের পর এক ভারী হচ্ছে – কারও ক্ষমতার হিসেব, কারও যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর হিসেব, কারও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক হিসেব। এই দানবীয় কাজ রুখতে শুধু সরকার নয় সবার ঐক্য বড্ড বেশী প্রয়োজন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*